নির্বাচনী সহিংসতার মামলায় নৌকার বিদ্রোহী প্রার্থীসহ ১১৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আড়াই হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।

নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনায় করা মামলায় নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার ঘোষনগর ইউনিয়নের পাঁচটি গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে গ্রেপ্তার–আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পঞ্চম ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে গত ৫ জানুয়ারি পুলিশের ওপর হামলা ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মামলা করার পর থেকে এ পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনের দিন ঘোষনগর ইউপির দুটি কেন্দ্রে ফলাফল ঘোষণা নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনার পরদিন ৬ জানুয়ারি পত্নীতলা থানার উপপরিদর্শক রিমন দত্ত বাদী হয়ে আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী’ স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী ফারজানা পারভীন, তাঁর স্বামী মতিউর রহমানসহ ১১৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা দুই থেকে আড়াই হাজার ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করেন। ওই মামলায় স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী ফারজানা পারভীনসহ এ পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পুলিশের ওপর হামলা ও গাড়ি পোড়ানোর ওই এক মামলায় গ্রেপ্তার–আতঙ্কে এক মাস ধরে পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে ঘোষনগর ইউনিয়নের কমলাবাড়ী, আমেদাপুর, গবরাকুড়ি, জামগ্রাম ফকিরপাড়া ও কুলিবাড়ি গ্রাম। বন্ধ রয়েছে ওষুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান। এ ছাড়া বাড়িতে পুরুষ সদস্যরা না থাকায় মাঠে বোরো ধানের চারা লাগাতে পারছে না অধিকাংশ পরিবার। এমন পরিস্থিতিতে ঘোষনগর ইউনিয়নের ওই পাঁচ গ্রামের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে সহিংসতার ঘটনায় স্থগিত হয়ে যাওয়া ঘোষনগর ইউনিয়নের কমলাবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ঘোষনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে পুনরায় ভোট গ্রহণের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। ৭ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্র দুটিতে ভোট গ্রহণ করার কথা। গ্রেপ্তার–আতঙ্কে অধিকাংশ ভোটারদের কেন্দ্রে আনাকে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন ফারজানা পারভীনের কর্মী-সমর্থকেরা।
সাধারণত সকাল থেকে রাত পর্যন্ত জমজমাট থাকে মাতাজীহাট-ফতেপুর সড়কের কমলাবাড়ী মোড়। ওই মোড়েই নির্বাচনের দিন সহিংসতার ঘটনা ঘটে। গতকাল বুধবার দুপুর ১২টার দিকে কমলাবাড়ী মোড় মার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, ৪টি মার্কেটের প্রায় ৩০টি আধা পাকা দোকানের সব কটি বন্ধ, রাস্তায়ও কোনো লোকজন নেই। জমজমাট মোড়টিতে বিরাজ করছিল সুনসান নীরবতা। ওই মোড় থেকে ২০-৩০ হাত দূরেই রাস্তার ওপর পোড়া অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায় একটি পুলিশ ভ্যান ও পুলিশের রিকুইজিশন করা একটি মাইক্রোবাস।
কমলাবাড়ী মোড় থেকে পূর্ব দিকে আধা কিলোমিটার দূরে কমলাবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ঘোষনগর ইউপির ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটকেন্দ্র এটি। স্কুলের পাশেই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী ফারজানা পারভীনের বাড়ি। বাড়িটির একাংশে পোড়া টিন, কাঠ ও মালামাল পড়ে আছে।
কমলাবাড়ী গ্রামের ভেতরে গিয়ে দেখা মিলল কয়েকজন নারী ও শিশুর। তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে ভয়ে কেউ কথা বলতে রাজি হচ্ছিলেন না। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে শিউলি খাতুন (৪৫) নামের এক নারী বলেন, ‘হামার পুরুষ (স্বামী) কমলাবাড়ী মোড়ে সাইকেলের ম্যাকারির কাজ করে। মারামারির পর থেকে গ্রেপ্তারের ভয়ে বাড়িত আসে না। ১৬ বছরের ব্যাটা (ছেলে) সেও পালায়ে পালায়ে থাকে। আয়রোজগার সব বন্ধ হয়ে গেছে।’
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কমলাবাড়ী মোড় মার্কেটের দোকানদার আবদুস সামাদকে দোকান খুলে কিছু পণ্যসামগ্রী নিয়ে যেতে দেখা যায়। তিনি বলেন, ‘গ্রেপ্তারের ভয়ে নিজের দোকান থেকেই চোরের মতন জিনিসপত্র নিয়ে যাচ্ছি। অথচ আগে প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত এসব দোকান খোলা থাকত। সহিংসতার ঘটনার পর ভয়ে কেউ দোকান খুলছেন না। যখন-তখন পুলিশ গ্রামে আসতেছে।’
আবদুস সামাদ বলেন, গত মঙ্গলবারও জমিতে ধান লাগানোর সময় মাঠ থেকে আমেদাপুর, গবরাকুড়ি ও জামগ্রামের চারজনকে আটক করে নিয়ে গেছে পুলিশ। পত্নীতলা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হাবিবুর রহমান বলেন, পুলিশের ওপর হামলা ও গাড়ি পোড়ানোর ঘটনায় করা মামলায় এখন পর্যন্ত ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তবে নির্দোষ কাউকে হয়রানি করা হবে না।