কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক উপকূলের মহালে উৎপাদিত হচ্ছে ছুরি শুঁটকি
কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক উপকূলের মহালে  উৎপাদিত হচ্ছে ছুরি শুঁটকি

কক্সবাজার

ঈদের ছুটিতে আসা পর্যটকের জন্য মজুত ২০ কোটি টাকার বড় শুঁটকি

কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর পশ্চিম তীরে নতুন ফিশারিঘাট ও মগচিতাপাড়া। পাড়ার ৩০-৪০টি মহাল (খামার) ও বাঁশের মাচায় ঝুলছে বড় বড় সামুদ্রিক মাছ লাক্ষ্যা, মাইট্যা, কোরাল, চাপা, রাঙাচকি, গুইজ্যা, পোপা, রুপচাঁদা ইত্যাদি। সূর্যের তাপে কাঁচা মাছগুলো শুকিয়ে শুঁটকিতে পরিণত হচ্ছে। এই শুঁটকি উৎপাদিত হচ্ছে শুধু পর্যটকদের জন্য।

কক্সবাজার শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ সমবায় সমিতির সভাপতি জয়নাল আবেদীন প্রথম আলোকে বলেন, আগামীকাল মঙ্গলবার শুরু হচ্ছে খুশির ঈদ। এরপর টানা সাত দিনের ছুটিতে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে আসছেন অন্তত ১০ লাখ পর্যটক। পর্যটকেরা বাড়ি ফেরার সময় কয়েক কেজি করে শুঁটকি কিনে নিয়ে যান। চাহিদা পূরণে বড় মাছকে শুঁটকিকরণে ঝুঁকছেন ব্যবসায়ীরা।

শুঁটকি উৎপাদনকারীরা বলেন, সমুদ্রসৈকতের কলাতলী, সুগন্ধা পয়েন্টসহ শহরের বিভিন্ন অলিগলিতে বেশ কিছু দোকানে পাকিস্তান, ভারত ও মিয়ানমার থেকে আনা মেয়াদোত্তীর্ণ শুঁটকি বিক্রি হচ্ছে। কক্সবাজারে উৎপাদিত শুঁটকি মনে করে পর্যটকেরা বিদেশি শুঁটকি কিনে প্রতারিত হচ্ছেন। তাতে কক্সবাজারের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। পর্যটকদের বিষমুক্ত শুঁটকি পৌঁছে দিতে উপকূলে শুঁটকির উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে। ঈদের ছুটিতে আসা পর্যটকদের জন্য অন্তত ২০ কোটি টাকার ৩৬০ মেট্রিক টন বড় শুঁটকি মজুত রাখা হয়েছে। এবার নাজিরারটেক, মহেশখালীর সোনাদিয়া, কক্সবাজারের খুরুশকুল, চৌফলদণ্ডী, টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, বাহারছড়া ও সেন্ট মার্টিনের সাত শতাধিক মহালেও উৎপাদিত হয়েছে আরও ৩০০ মেট্রিক টনের বেশি ছোট আকৃতির ছুরি, লইট্যা, পোপা, ফাইস্যা, চিংড়ি মাছের শুঁটকি।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এস এম খালেকুজ্জামান বলেন, গত মৌসুমে জেলায় ২০ হাজার ৬৩৭ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদিত হয়েছিল। এবার শুঁটকির উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৬ হাজার মেট্রিক টন, যার বাজারমূল্য ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা। এবার মৌসুমজুড়ে প্রচণ্ড গরম বিরাজ করায় শুঁটকির উৎপাদনও বেড়েছে।

বড় শুঁটকিতে আকর্ষণ পর্যটকের

কক্সবাজার শহরের মগচিতাপাড়ায় বাঁশে বেঁধে তৈরি হচ্ছে লাক্ষ্যা ও কোরাল শুঁটকি

আজ সোমবার বেলা আড়াইটা। বাঁকখালী নদীর নতুন ফিশারিঘাট পাড়ার শুঁটকি ব্যবসায়ী আলী হোসেনের মহালে গিয়ে দেখা যায়, বাঁশের মাচায় ঝুলছে শতাধিক বড় বড় সামুদ্রিক মাছ। প্রতিটির ওজন দুই থেকে চার কেজি। কাঁচা থাকতে এই মাছের ওজন ছিল দ্বিগুণ। কয়েকজন শ্রমিক মাছগুলো নড়াচড়া করছেন, যেন সূর্যের তাপ মাছের গায়ে ঠিকমতো পড়ে। পাশের গুদামে রাখা হয়েছে শুঁটকি মাছের স্তূপ। মাছের মধ্যে রয়েছে লাক্ষ্যা, কোরাল, মাইট্যা, রুপচাঁদা, চাপাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ।

মহালের মালিক আলী হোসেন (৩৮) বলেন, পর্যটকদের বিক্রির জন্য তিনি প্রায় ৩৫ লাখ টাকার ৫ মেট্রিক টন বড় শুঁটকি মজুত রেখেছেন। কাঁটা কম আছে এমন বিষমুক্ত শুঁটকি পর্যটকের চাহিদা। দামে কিছুটা বেশি হলেও বড় শুঁটকি অনেক সুস্বাদু। বর্তমানে মহালে পাইকারিতে প্রতি কেজি মাইট্যা বিক্রি হচ্ছে ৭০০-১০০০ টাকায়, লাক্ষ্যা ২৫০০-৩০০০ টাকা, কোরাল ১০০০-১২০০ টাকা, রুপচাঁদা ১৭০০-২৮০০ টাকা, চাপা ৬০০-৮০০ টাকায়। শহরের বিভিন্ন দোকানে এই শুঁটকি কেজিতে আরও ৫০-১০০ টাকা বেশিতে বিক্রি হচ্ছে।

বড় বড় শুঁটকিতে ভরপুর মগচিতাপাড়ার ফরিদ আলমের মহালটি। মহালে লাক্ষ্যা, মাইট্যা, চাপার পাশাপাশি ছোট আকৃতির মাছ চিংড়ি, ছুরি, লইট্যা, ফাইস্যা শুঁটকিও উৎপাদন হচ্ছে। প্রতি কেজি চিংড়ি শুঁটকির দাম ১০০০-১৫০০ টাকা, ছুরি ৬০০-১৩০০ টাকা, লইট্যা ৫০০-৭০০ টাকা। ফরিদ আলম (৪২) বলেন, এবার পর্যটকদের প্রতারণা থেকে রক্ষার জন্য বড় মাছের শুঁটকি উৎপাদিত হচ্ছে। তরতাজা এই শুঁটকি হাতে নিলেই যে কেউ বুঝতে পারবেন মাছটি কক্সবাজার উপকূলে উৎপাদিত। ঈদের ছুটিতে আসা পর্যটকদের বিক্রির জন্য তিনি প্রায় ২১ লাখ টাকার অন্তত ৩ মেট্রিক টন বড় মাছের শুঁটকি মজুত রেখেছেন।

কক্সবাজার শহরের নতুন ফিশারিঘাট পাড়ায় বাঁশের মাচায় উৎপাদিত হচ্ছে বড় মাছের শুঁটকি

সমিতির সভাপতি জয়নাল আবেদীন বলেন, কলাতলী ও সুগন্ধা সৈকত এলাকার শুঁটকির দোকানগুলোতেই পর্যটকেরা বেশি প্রতারণার শিকার হন। পর্যটকেরা সামুদ্রিক মাছ তেমন চেনেন না। এই সুযোগে কতিপয় ব্যবসায়ী সাপের মতো লম্বা কামিলা মাছকে কেটেকুটে কোরাল মাছ বলে ধরিয়ে দিচ্ছেন। অথচ কামিলা মাছ মুসলমানরা খান না। পোপা মাছকে লাক্ষ্যা মাছ, মাইট্যা বলে চাপা মাছ এবং রুপচাঁদা বলে টেকচান্দা ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এক কেজি লাক্ষ্যা মাছের শুঁটকির দাম ২৩০০ টাকা, আর পোপা শুঁটকির দাম ৭০০ টাকা। প্রতি কেজি রুপচাঁদার দাম ২৩০০ টাকা, আর টেকচান্দার দাম ৩০০-৪০০ টাকা। শুঁটকির প্যাকেটে মাছের প্রকৃত নাম ও মূল্য লিখে রাখার নিয়ম থাকলেও মানা হচ্ছে না।

শুঁটকি ব্যবসায়ীরা বলেন, বর্তমানে শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ সমবায় সমিতির ১২০ জন সদস্যের আওতায় (প্রত্যেকের ২-৫ মেট্রিক টন) অন্তত ৩৬০ মেট্রিক টন বড় মাছের শুঁটকি মজুত রয়েছে। যার বাজারমূল্য ২০ কোটি টাকার বেশি। শুঁটকিগুলো ১০ দিন আগে উৎপাদিত হয়েছে। তা ছাড়া ৩০ মে পর্যন্ত এসব মহালে আরও ৭০০-৮০০ মেট্রিক টন বড় মাছের শুঁটকি উৎপাদিত হবে। স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে বড় শুঁটকির উল্লেখযোগ্য অংশ সরবরাহ হবে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে।

ছোট শুঁটকির কদরও বাড়ছে

কক্সবাজার পৌরসভার ১ ও ২ নম্বর ওয়ার্ডের নাজিরাটেক, নুনিয়াছটাসহ ১৮টি গ্রামে শুঁটকি উৎপাদনের মহাল আছে ৯৫০টি। দেশের বৃহৎ এই শুঁটকিপল্লিতে প্রতিদিন গড়ে ৪৭ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদিত হচ্ছে। বেশির ভাগ ছুরি, লইট্যা, ফাইস্যা, পোপা মাছ।

৯৯১ সদস্যের নাজিরারটেক বহুমুখী মৎস্য ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি আতিক উল্লাহ বলেন, গত মৌসুমে (২০২১ সালের নভেম্বর, ডিসেম্বর, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ, এপ্রিল ও মে) সমিতির সদস্যরা প্রায় ২০০ কোটি টাকার ৫৬ হাজার মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদন করেছিলেন। এবার উৎপাদন আরও বেড়েছে। করোনা মহামারি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় কক্সবাজারে পর্যটকের আগমন বাড়ছে। তাতে শুঁটকির চাহিদাও বাড়ছে।

কক্সবাজার ফিশিংবোট মালিক সমিতির সভাপতি মুজিবুর রহমান বলেন, প্রায় ছয় হাজার ট্রলার নিয়ে বঙ্গোপসাগর থেকে ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছ আহরণ করছেন জেলার অন্তত ৯৮ হাজার জেলেশ্রমিক। আহরিত মাছের উল্লেখযোগ্য অংশ জেলার প্রায় দুই হাজার মহালে শুঁটকি করা হচ্ছে।