কক্সবাজার সদর হাসপাতাল

কথায় কথায় চিকিৎসা বন্ধ

কক্সবাজার সদর হাসপাতালে কথায় কথায় তালা ঝুলিয়ে দিয়ে চিকিৎসা বন্ধ করে দেওয়ার প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে সাধারণ মানুষ। সামাজিক ও অধিকার আদায়ের সংগঠনগুলোও চিকিৎসকদের এ অনিয়মের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। তাঁদের দাবি, সেনাবাহিনী থেকে পরিচালক নিয়োগ দিয়ে হাসপাতালের চলমান অচলাবস্থা দূরীকরণ জরুরি।

ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দাবি, মানবিক সেবা দেওয়ার পরও তাঁদের ওপর বারবার হামলা হচ্ছে। এ নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তাঁরা। ফলে বাধ্য হয়ে কর্মসূচি দিতে হচ্ছে তাঁদের।

সামাজিক আন্দোলনের নেতাদের অভিযোগ, ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা সামান্য ভুল–বোঝাবুঝি হলেই আন্দোলনের নামে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা বন্ধ করে দেন। এর ফলে অসহায়-দরিদ্র মানুষগুলো চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত হচ্ছে। অনেক সময় চিকিৎসা না পেয়ে রোগী মারাও যাচ্ছে। ইন্টার্ন চিকিৎসকদের এই নৈরাজ্য আর চলতে দেওয়া যায় না। এর স্থায়ী সমাধান দরকার।

এদিকে আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে সদর হাসপাতালে এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবিতে বিক্ষোভ–সমাবেশের ডাক দিয়েছে সামাজিক সংগঠন ‘আমরা কক্সবাজারবাসী’। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত আছেন।

এর আগে গত সোমবার কক্সবাজার প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ধর্মঘটের কারণে বিনা চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর জন্য চিকিৎসকদের দায়ী করে তাঁদের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে মামলা করার হুঁশিয়ারি দেয় কক্সবাজার উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদ।

ওই সংগঠনের সভাপতি রুহুল আমিন সিকদার বলেন, ৪ থেকে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত ধর্মঘটে সাতজন রোগী চিকিৎসা না পেয়ে মারা গেছেন। তাঁদের পরিবারের পক্ষ হয়ে উচ্চ আদালতে মামলা করা হবে। তিনি বলেন, জেলার সর্ববৃহৎ ২৫০ শয্যার হাসপাতালটি ঠিকমতো পরিচালিত হচ্ছে না। চিকিৎসকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক ব্যবসা সরকারি এই হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়েছে। এখন সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তাকে পরিচালক নিয়োগ করে হাসপাতালটি পরিচালনার জন্য প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরে চিঠি পাঠানো হচ্ছে।

৪ এপ্রিল সদর হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর অভিযোগ তুলে চিকিৎসককে মারধর করেন রোগীর স্বজনেরা। এ ঘটনায় কর্মবিরতি শুরু করেন ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা।

ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা হাসপাতালে সরকারি চিকিৎসকদেরও কাজে যোগ দিতে বাধা দেন। এর ফলে ৬ এপ্রিল রাত পর্যন্ত চিকিৎসা কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। ৭ এপ্রিল বিকেলে চিকিৎসাসেবা চালু হলেও ৯ এপ্রিল মঙ্গলবার সকাল নয়টা থেকে আবারও বন্ধ হয়ে যায়। এতে রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

সংকট নিরসনে তদন্ত কমিটি গঠন

সদর হাসপাতালে একের পর এক ধর্মঘটের নামে শুরু হওয়া সংকট নিরসনে গতকাল বুধবার দুপুরে জেলা প্রশাসনের শহীদ এ টি এম জাফর আলম সম্মেলনকক্ষে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আশরাফুল আফসার, কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র মুজিবুর রহমান, কক্সবাজার সদর হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. বিধান পাল, বিএমএ কক্সবাজার শাখার সাধারণ সম্পাদক ডা. মাহবুবুর রহমানসহ বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক দলের নেতা ও গণমাধ্যমকর্মীরা।

বৈঠকে হাসপাতালের অচলাবস্থায় গরিব রোগীদের দুর্ভোগ, কথায় কথায় ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতি ও হাসপাতালের গেটে তালা লাগিয়ে কর্মবিরতি পালনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক ব্যবসা রমরমা করতে সরকারি হাসপাতালে অচলাবস্থার সৃষ্টি করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠকে হাসপাতালের চলমান সমস্যার অনুসন্ধানের জন্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আশরাফুল আফসারকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। ওই কমিটিতে প্রত্যেক শ্রেণি–পেশার প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ওই হাসপাতালের আইনশৃঙ্খলাসহ নানা সমস্যাদি দেখভাল করবে এই কমিটি।

জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, সদর হাসপাতাল জনগণের চিকিৎসাসেবার একমাত্র অবলম্বন। ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা কথায় কথায় ধর্মঘট করতে পারেন না। সরকারি চিকিৎসকেরা তো প্রশ্নই উঠে না। জরুরি চিকিৎসাসেবা বন্ধ রাখার মতো ঘটনা কোনোভাবে কাম্য নয়। একের পর এক কর্মবিরতির নামে যে ঘটনাগুলো সৃষ্টি হচ্ছে সেগুলোতে রাজনৈতিক চক্রান্ত আছে কি না, খতিয়ে দেখা দরকার।

পুলিশ সুপার মাসুদ হোসেন বলেন, হাসপাতালের অচলাবস্থা নিয়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগের নানা মাধ্যমে ব্যাপক লেখালেখি হচ্ছে। কিন্তু সব লেখালেখি হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে। এটা খুবই খারাপ লক্ষণ।

তদন্ত কখন শুরু হবে জানতে চাইলে কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আশরাফুল আফসার প্রথম আলোকে বলেন, আগামী সোমবার থেকে তদন্তকাজ শুরু হবে।

সকালে অচল বিকেলে সচল

সকাল ১০টায় সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, রোগীর ভিড়। কিন্তু চিকিৎসকের দেখা নেই। কিন্তু দুপুরের পর ইন্টার্ন চিকিৎসকসহ হাসপাতালের চিকিৎসকেরা কাজে যোগ দিয়েছেন।

বিকেল চারটার দিকে হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, চিকিৎসা কার্যক্রম স্বাভাবিক। কয়েকটি ওয়ার্ডে বরাদ্দ শয্যার চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে। আউটডোরেও রোগীদের ভিড় দেখা যায়।

হাসপাতালের পঞ্চম তলায় পুরুষ সার্জারি ওয়ার্ডে শয্যা সংখ্যা রয়েছে ৩০টি। কিন্তু সেখানে বুধবার ভর্তি ৪২ জন রোগী। একইভাবে মহিলা সার্জারি ওয়ার্ডেও আসনের চেয়ে অতিরিক্ত রোগী দেখা যায়। ওয়ার্ডগুলোতে সরকারি চিকিৎসকদের পাশাপাশি সেবা দিচ্ছেন ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) শাহীন আব্দুর রহমান বলেন, এখন চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। পুরোদমে সেবা চলছে। রোগীরা আসছেন। ইন্টার্ন চিকিৎসকেরাও কাজে যোগ দিয়েছেন।