প্রায় ৩৫ বিঘা আয়তনের জমিটির প্রকৃত মালিক সাবেক যুগ্ম সচিব আব্দুস সাত্তার মিয়া। এ ঘটনায় আদালতে মামলা করেছেন তিনি।

বাগেরহাটের মোংলায় ভুয়া মালিককে দিয়ে প্রায় ৩৫ বিঘা জমি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘ডরিন পাওয়ার হাউস অ্যান্ড টেকনোলজিস লিমিটেড’–এর নামে নিবন্ধন করে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাহজীব আলম সিদ্দিকী ঝিনাইদহ-২ আসনের সাংসদ।
মোংলা উপজেলার বুড়িরডাঙ্গা ইউনিয়নের ৫ নম্বর সানবান্দা মৌজার দাগ নম্বর এসএ ৭০–এর ওই জমির মালিক অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব
আব্দুস সাত্তার মিয়া বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তিনি দাবি করেন, ভুয়া মালিক সাজিয়ে বরিশালের এক ব্যক্তির মাধ্যমে তাঁর জমি বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে, যা উপজেলা সাব–রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রিও হয়েছে। এ ঘটনায় গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বাগেরহাট আদালতে একটি মামলা করেন আব্দুস সাত্তার মিয়া।
মোংলায় আমার ল্যান্ড ডিপার্টমেন্ট জমি কিনেছে। প্রতারণা হয়েছে বলে একটা অভিযোগ শুনেছি। এ বিষয়ে আমার আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলছি। তাঁদের মতামতের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।তাহজীব আলম সিদ্দিকী, সাংসদ, ঝিনাইদহ-২ আসন
এ সম্পর্কে সাংসদ তাহজীব আলম সিদ্দিকী মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘মোংলায় আমার ল্যান্ড ডিপার্টমেন্ট জমি কিনেছে। প্রতারণা হয়েছে বলে একটা অভিযোগ শুনেছি। এ বিষয়ে আমার আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলছি। তাঁদের মতামতের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১৫ ডিসেম্বর সাবেক আমলা আব্দুস সাত্তার মিয়ার প্রায় ৩৫ বিঘা জমি জালিয়াতি করে দলিল করা হয়। দালাল চক্রের মূল হোতা মোংলা পৌর শহরের গিয়াস উদ্দিন সড়কের বাসিন্দা মো. হাসমত আলী। তিনি
প্রকৃত মালিক আব্দুস সাত্তার মিয়ার জায়গায় বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার দেহেরগতি পূর্বপাড়ার বাসিন্দা মো. আব্দুল ছত্তার হাওলাদারকে মালিক সাজিয়ে ওই জমি ডরিন পাওয়ার হাউস অ্যান্ড টেকনোলজিস লিমিটেডের কাছে বিক্রি করান। ১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা দলিলমূল্যে ওই জমি প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাহজীব আলম সিদ্দিকীর নামে রেজিস্ট্রি করা হয়। জমি বিক্রি ও রেজিস্ট্রির ওই ঘটনায় কয়েক কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।
তবে ‘ডরিন পাওয়ার হাউস অ্যান্ড টেকনোলজিস লিমিটেড’ এর প্রকৌশলী মনজুরুল নাসিম সাংবাদিকদের বলেন, ‘দালাল হাসমত আলী ও রিয়াদ চক্রের খপ্পরে পড়ে আমরা প্রতারণার শিকার হয়েছি। তাঁরা আমাদের ভুল জমি কিনে দিয়েছেন। এর জন্য তাঁরাই দায়ী। আমরা তাঁদের জমির জন্য টাকা দিয়েছি। আমাদের ম্যানেজমেন্ট বসে তাদের (দালাল) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে।’
তবে এ বিষয়ে অভিযুক্ত দালাল হাসমত আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও এ নিয়ে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি হননি। অপর অভিযুক্ত রিয়াদকে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। মোংলা উপজেলা সাব–রেজিস্ট্রার মো. জুবায়ের হোসেন বলেন, জমিটির দলিল রেজিস্ট্রি হওয়ার পর তিনি অভিযোগটি জানতে পারেন। পরে বিভিন্ন মাধ্যমে জালিয়াতির বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে সংশ্লিষ্ট দলিল লেখক (মুহুরি) আবুল কালাম শেখকে গত ২৬ জানুয়ারি কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়।
তবে দলিল লেখক আবুল কালাম শেখ দাবি, দলিল লেখার পর রেজিস্ট্রির আগে সব কাগজ যাচাই-বাছাই করার দায়িত্ব সাব–রেজিস্ট্রারের। কিন্তু তিনি সেটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে না দেখে উল্টো তাঁকে অভিযুক্ত করে কারণ দর্শানো নোটিশ দিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জমিটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা। তবে দলিলে মূল্য দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। ভুয়া মালিক সাজিয়ে দলিল করার বিষয়টি জানাজানি হওয়ার ঘটনা ধামাচাপা দিতে দালাল চক্র নানা অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
মোংলার ইউএনও কমলেশ মজুমদার মুঠোফোনে বলেন, বিষয়টি জেনে তিনি সাব–রেজিস্ট্রারের সঙ্গে কথা বলেছেন। ভুয়া লোককে মালিক সাজিয়ে যে দলিল হয়েছে, বিষয়টি সত্য। সাব–রেজিস্ট্রার বলেছেন, তিনি বিষয়টি বুঝতে পারেননি। এর সঙ্গে একটি চক্র জড়িত।
এ ঘটনায় দলিল লেখকসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানিয়ে ইউএনও আরও বলেন, যেহেতু দলিলটি রেজিস্ট্রি হয়ে গেছে। এখন আদালত দলিলটি বাতিল করলে তা বাতিল হবে।