জাগরণের গানে গানে পাঁচ করোনাজয়ীকে বিদায়

বগুড়ার মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিটে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হওয়ার পর বাড়ি ফেরার সময় পাঁচ ব্যক্তিকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। গতকাল বুধবার তোলা ছবি: প্রথম আলো
বগুড়ার মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিটে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হওয়ার পর বাড়ি ফেরার সময় পাঁচ ব্যক্তিকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। গতকাল বুধবার তোলা ছবি: প্রথম আলো

হাসপাতালের বিশাল বারান্দার দুপাশে ফুলেরগুচ্ছ হাতে দাঁড়িয়ে আছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। সবার চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক। মাঝ দিয়ে হেঁটে হেঁটে আসছেন পাঁচ করোনাজয়ী (কোভিড-১৯) নারী-পুরুষ। মুখে আইসোলেশন থেকে মুক্তির আনন্দ। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা করতালি দিয়ে অভিবাদন জানালেন। গাইলেন জাগরণের গান , ‌‌'‌আমরা করব জয়, আমরা করব জয় একদিন‌'। সেই গানের সঙ্গে সুর মেলালেন পাঁচ করোনাজয়ী । হাত নেড়ে তাঁরাও চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীরা প্রত‍্যেকের হাতে তুলে দিলেন এক গুচ্ছ করে ফুল। এই দৃশ্য আইসোলেশন ঘোষিত বগুড়ার মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের । বুধবার হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া ওই পাঁচ রোগীকে বিদায় জানাতে এই আয়োজন।

মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এটিএম নুরুজ্জামান এবং আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) শফিক আমিন ছাড়াও সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সামির হোসেনসহ অন্য চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা করোনাজয়ী রোগীদের হাতে ফুল তুলে দেন। এ সময় বগুড়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) মাসুম আলী বেগ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে করোনাজয়ী প্রত্যেকের হাতে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ১০ হাজার টাকা সহায়তার চেক তুলে দেন।

বুধবার আইসোলেশন থেকে ছাড়পত্র পাওয়া পাঁচ করোনাজয়ী রোগী হলেন ঢাকার একটি বেসরকারি কলেজের শিক্ষক এবং বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার গনকপাড়ার মামুনুর রশিদ (২৮), নারায়নগঞ্জে বেসরকারি রোগ নির্ণয় কেন্দ্র পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কর্মী ও সারিয়াকান্দি উপজেলার নারচি এলাকার বাসিন্দা রিপন হোসেন (২৫), সোনাতলা উপজেলার আচারের পাড়া গ্রামের গৃহবধূ ঢাকাফেরত কোহিনুর মুজিব (৪৭), ধুনট উপজেলার মথুরাপুর গ্রামের পোশাক কারখানার শ্রমিক নুরুন্নবী (২০), সারিয়াকান্দি উপজেলার মামুনুর রশিদ (২৮) ও বগুড়া শহরের সবুজবাগ এলাকার বাসিন্দা জাহিদুল ইসলাম (৪০)। করোনাজয়ী এই পাঁচজনের সঙ্গে করোনার উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী মৌসুমী বেগম (২৮) এর নমুনা পরীক্ষায় ‘নেগেটিভ’ রিপোর্ট আসায় তাঁকেও ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও ) শফিক আমিন বলেন, ঢাকাফেরত বেসরকারি কলেজের শিক্ষক মামুনুর রশিদের নমুনা পরীক্ষায় ২৪ এপ্রিল করোনা 'পজিটিভ' শনাক্ত হয়। ওই দিন তাঁকে আইসোলেশনে ভর্তি করা হয়। ৩০ এপ্রিল এবং ৬ মে দুই দফা নমুনা পরীক্ষায় তাঁর করোনা 'নেগেটিভ' শনাক্ত হওয়ায় তাঁকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। করোনা আক্রান্ত রিপন এবং তাঁর স্ত্রীকে ২২ এপ্রিল আইসোলেশনে ভর্তি করা হয়। ৩০ এপ্রিল এবং ৬ মে দুই দফা রিপন করোনা ‘নেগেটিভ’ শনাক্ত হয়েছেন। ঢাকা থেকে ফিরে সোনাতলার কোহিনুর মুজিব ২২ এপ্রিল করোনা 'পজিটিভ' শনাক্ত হন। ৩০ এপ্রিল এবং ৬ মে দুই দফা নমুনা পরীক্ষায় তিনি করোনা 'নেগেটিভ' শনাক্ত হয়েছেন।

মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও ) শফিক আমিন আরও বলেন, করোনায় আক্রান্ত নুরুন্নবী আইসোলেশনে ভর্তি হয়েছিলেন ২৩ এপ্রিল। ৩০ এপ্রিল এবং ৬ মে নমুনা পরীক্ষায় তাঁর শরীরে করোনার উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে করোনা ' পজিটিভ' শনাক্ত জাহিদুল ইসলাম প্রথমে বাড়িতেই আইসোলেশনে ছিলেন । পরে ৩০ এপ্রিল তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। ৪ এবং ৬ মে নমুনা পরীক্ষায় তিনি করোনা ‘নেগেটিভ’ শনাক্ত হন।

করোনাজয়ী মামুনুর রশিদ ,‌' আইসোলেশনে অসহায় দিনগুলো খুব কষ্টের। প্রতিটি রাত, প্রতিটি ক্ষণ কেটেছে প্রচণ্ড যন্ত্রণায়। জেলখানার বন্দী জীবনে তবুও কথা বলার সঙ্গী পাওয়া যায়। এখানে সময়গুলো কাটাতে খুব কষ্ট হয়েছে। হাসপাতাল থেকে ছুটি দেওয়ায় নতুন জীবন পেলাম।’

বুধবার হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়া রিপন হোসেন বলেন, ‘স্বামী-স্ত্রী দুজনই এক সঙ্গে করোনায় আক্রান্ত হয়েছি। মানসিকভাবে প্রচণ্ড ভেঙে পড়েছিলাম। হতাশায় ডুবে যাচ্ছিলাম। বারবার মনে হয়েছিল, করোনায় আক্রান্ত হয়ে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই মারা যাব। চিকিৎসকেরা সব সময় মানসিকভাবে শক্তি ও সাহস জুগিয়েছেন। তাঁদের কারণেই সুস্থ হলাম।’

এর আগে মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল থেকে করোনা জয় করে ফিরেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সদস্য আদমদীঘি উপজেলা আহসান হাবিব (২৯) এবং রংপুরের শ্রমজীবী শাহ আলম (৫০)।

হাসপাতাল প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জেলায় বর্তমানে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২৮ জন। এর মধ্যে মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের আইসোলেশনে চিকিৎসা নিয়ে ৭ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন । আইসোলেশনে রয়েছেন ৪ জন । অন্যরা বাড়িতেই আইসোলেশনে রয়েছেন।