
‘মার প্যাটতে পড়া ধরেই কষ্ট। আর এখন মরণকালেও কষ্ট। জীবনে সুখটা পালাম কই! ছোটবেলায় যখন সবাই দৌড়ে বেড়ায়, খেলে বেড়ায়, লাফায়, পড়ালেখা করে, তখন থেকেই আমার কাজ করে খাতি হচ্ছে। বাপের ঘর থেকে স্বামীর ঘরে আইসেও কাজ করেই খাতি হচ্ছে। সুখ যদি মরে গেলি আল্লাহ দেয়।’ কথাগুলো কারিমা বেগমের। ৬০ ছুঁই ছুঁই ওই নারী এ বয়সেও জীবিকার জন্য দিন-রাত পরিশ্রম করে চলেছেন। নানা জীবিকায় ভর করে চালিয়ে নেওয়া জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এখন কোয়েলের সেদ্ধ ডিম বিক্রি করছেন।
কারিমার দিন শুরু হয় ফজরের আজানের সময় থেকে। রাত ১০টার আগে আর অবসর মেলে না। বাড়ি তাঁর রূপসা উপজেলার দেয়াড়া গ্রামে। ডিম বিক্রি করেন শহরের জেলাখানা ঘাটে। ফজরের আজানের সময় উঠে এক চুলায় ডিম সেদ্ধ করতে দেন। পাশের চুলায় চলে রান্নার কাজ। সকাল ছয়টার আগেই ডিম নিয়ে ফেরিঘাটে পৌঁছে যান। এরপর ভৈরব নদ পার হয়ে জেলখানা ঘাট ফেরির পন্টুনের গ্যাংওয়ের মাথায় খোলা আকাশের নিচে বেচাবিক্রি শুরু করেন।
আজ মঙ্গলবার সকালে সেখানে বসেই জীবনের বাঁকে বাঁকে জমানো গল্পের কিছু কিছু শোনালেন কারিমা। শোনালেন তাঁর সেই ছেলেবেলার কথা, শহরে আসার কথা, জীবনসংগ্রামের কথা। কথার ফাঁকে ডিম বিক্রিও চলতে থাকল। কথায় কথায় জানা গেল, রামপালের গৌরম্ভার বর্ণি গ্রামে বাবার বাড়ি কারিমার। ১০ ভাইবোনের মধ্যে তিনিই বড়। অভাবের সংসারে কয়েক দিন স্কুলে যাওয়ার পর আর পড়ালেখাটা হয়নি। বয়স যখন সাত কিংবা আট, তখন শহরে আসেন।
এরপর বাসাবাড়ির কাজে ঢুকে পড়েন। পরে ডালের মিল আর মাছের কোম্পানিতেও কাজ করেছেন। বিয়ের পরও কাজ করতেন ডকইয়ার্ডে। এরপর স্বামীর সঙ্গে দরজির কাজ শুরু করেন। শহরের খানজাহান আলী হকার্স মার্কেটে স্বামী-স্ত্রী মিলে মশারি, বালিশের কাভার, বিছানার চাদর সেলাই করতেন। এ সময় সংসারে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য আসতে শুরু করে। তবে সেই স্বাচ্ছন্দ্য স্থায়ী রূপ নেওয়ার আগেই স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়েন। কাজও বন্ধ হয়ে যায় তাঁদের। বছর সাতেক আগে কারিমার স্বামী মারা গেছেন। জন্মের পর মারা গেছে তাঁর তিন সন্তান।
কারিমা বলেন, ‘দরজির কাজ বন্ধ হওয়ার পর সংসারে অভাব দেখা দেয়। এদিকে স্বামীর চিকিৎসাও করা লাগছিল। একদিন স্বামীকে নিয়ে হাসপাতালে আসার পর দেখি হাসপাতালের সামনে একজন কোয়েলের ডিম বিক্রি করছে। ব্যবসাটা কেন জানি মনে ধরল। ডিমওয়ালার কাছ থেকে জানলাম সিংহেরচর থেকে সে ডিম কিনে বেচে। স্বামীকে ডিমের ব্যবসার করব বলে জানালে সে রাজি হয়নি। এদিকে সংসার চলে না। তাকে না বলেই একদিন সিংহেরচর থেকে ৭৫০ টাকা দিয়ে ৫০০ ডিম কিনি। সেগুলো বালতিতে করে গ্রামে গ্রামে বিক্রি শুরু করি।’
ডিম বিক্রি পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার দুই বছরের মাথায় কারিমার স্বামী মারা যান। এরপর সংগ্রামটা আরও কঠিন হয়ে যায় কারিমার। শহরের জনাকীর্ণ জেলখানা ঘাট এলাকায় বেচাকেনা বেশি হবে চিন্তা করে শহরে আসতে থাকেন। তবে সেখানেও বাধে বিপত্তি।
কারিমা বলেন, ‘যখন আসছিলাম, তখন ঘাটে সাত থেকে আটজন ডিম বিক্রি করত। এখন তো আমি আর অন্য একজন আছে। প্রথম দিকে ঘাটে ডিম বিক্রি করতে গেলে খেদায়ে দিত, পাত্তা দিত না। নানা কথা শুনেও বেহায়ার মতো বসে থাকতাম। তারপরও চলে যেত বাধ্য করত। তখন সদর হাসপাতাল, থানার সামনে, কোর্টে, পার্কে ঘুরে ঘুরে ডিম বেচতাম। পরে ঘাটের এক কর্মচারীকে অভাব-অনটন আর সমস্যার কথা বুঝিয়ে বললে তিনি এই গোড়ায় বসিয়ে দিয়েছেন। পাঁচ বছর ধরে এখানেই বসি।’
হাঁস-মুরগির সেদ্ধ ডিমের চাহিদাও যেমন সব সময় থাকে না, তেমনি পুঁজিও বেশি লাগে। তাই শুধু কোয়েলের ডিম বিক্রি করেন কারিমা। তেরখাদা, দিঘলিয়া, গাজীর হাট, কাটেঙ্গা, রামপুরা—এসব এলাকার কোয়েলের খামার থেকে ডিম কেনেন। আগে নিজে গিয়েই কিনে আনতেন। এখন বাঁধা খামারিরা ফোনে যোগাযোগ করে পাঠিয়ে দেন।
প্রতিদিন ৫০০ ডিম আনেন। বেচা শেষে চলে যান। তবে বেচা শেষ করতে বেশির ভাগ দিনই রাত হয়ে যায়। ফিরে আবার রাতের রান্না করেন। ভোরে বাড়ি থেকে খেয়ে আসেন। দুপুরে কোনো দিন কিছু কিনে খান, কোনো দিন খাওয়া হয় না। সব ডিম বিক্রি করলে ২৫০ টাকার মতো লাভ থাকে। ডিম সেদ্ধ করা, আসা-যাওয়া আর নদী পারে প্রতিদিন ৭০ টাকা খরচ হয়ে যায়।
ডিমের দাম বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা নিয়ে কারিমা বলেন, ‘আগে কিনতাম কম দামে। এখন পিস দুই টাকা করে কিনতেছি। খাবারের দাম বাড়ায় আরও বেশি দামে কেনা লাগবে বলে ফোন করিছে। মানুষ চারটে দশ টাকায় কিনতি চায় না। কেনা দাম বাড়লি বিক্রি করব কী কইরে। এসব বেচে আবার ওষুধ কিনি। চাল, কাঠ, তেল—সব কেনা লাগে। সঞ্চয় যে করব, তারও উপায় নেই। চাল-ডাল কিনতিই তো দেনা হয়।’
ভবিষ্যৎকে নিয়তির হাতে সঁপে দিয়েছেন কারিমা। বললেন, ‘কষ্টের কোনো শেষ হলো না। জীবনভর সংগ্রাম করিছি। আগে বল ছিল, শক্তি ছিল। কিছু একটা করতি ইচ্ছা করত। এখন আর কিছু করতি ইচ্ছা করে না। সময় যত যাচ্ছে, সংগ্রাম যেন কঠিন হচ্ছে। শরীরে যখন কুলোবে না, যখন আর পারব না, তখন যা কপালে আছে, তা-ই হবে।’