কচুরিপানা দিয়ে নানা জিনিসপত্র তৈরির কাজে যুক্ত ২৪৫ জন নারী। তাঁদের তৈরি জিনিস রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপ-আমেরিকাতে

কচুরিপানার আর কী দাম! টাটকা কচুরিপানা গো–খাদ্য আর শুকালে হয় জ্বালানি। এই শুকনা কচুরিপানা থেকেই ঘর সাজানো আর দৈনন্দিন ব্যবহারের দারুণ সব জিনিসপত্র তৈরি করছেন গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার একদল নারী। তৈরি হচ্ছে কচুরিপানা থেকে ফুলের টব, হাতব্যাগ, পাপস, ঝুড়িসহ নানা জিনিসপত্র। তাঁদের কাছ থেকে এসব কিনে ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠান রপ্তানি করছে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, কানাডা ও নেদারল্যান্ডসে।
গাইবান্ধা শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের মদনেরপাড়া গ্রাম। সম্প্রতি ওই গ্রামে গিয়ে দেখা যায় কচুরিপানা নিয়ে এক কর্মযজ্ঞ। ঘরে বসে এই কাজ করে আয় করছেন ২৪৫ জন নারী।
চিকন লোহার রড দিয়ে ফুলের টব, হ্যান্ড ব্যাগ, ঝুড়ির কাঠামো বানানো হয়। বগুড়ার শেরপুর থেকে এসব কাঠামো তৈরি করে আনা হয়। এরপর শুকনা কচুরিপানা দিয়ে সাজানো হয় ফুলের টব, হ্যান্ড ব্যাগ, পাপস, ঝুড়ি। প্রতিটি ফুলের টব তৈরিতে মজুরিসহ খরচ পড়ে ১০০ টাকা। বিক্রি হয় ১২০ টাকা। এমনিভাবে প্রতিটি হ্যান্ড ব্যাগ তৈরিতে উৎপাদন খরচ ২০০ টাকা। বিক্রি হয় ৩০০ টাকা। প্রতিটি ঝুড়ি তৈরিতে উৎপাদন খরচ ৪০ টাকা। বিক্রি হয় ৬০ টাকা। প্রতিটি পাপস তৈরিতে উৎপাদন খরচ ২০০ আর বিক্রি হয় ২৫০ টাকায়।
নিভৃত পল্লিতে এই শিল্প গড়ে তোলার পেছনে রয়েছেন কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের মদনেরপাড়া গ্রামেরই সুভাষ চন্দ্র বর্মন (৪৫)। সুভাষ চন্দ্র অষ্টম শ্রেণি পাস। ২০০০ সালে ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় চাকরি নেন। এক বছর পর চাকরি চলে যায়। এরপর গাজীপুরে একটি হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন। এখানে কচুরিপানা থেকে নানা জিনিসপত্র তৈরি হতো। প্রায় সাত বছর চাকরি করেন। ২০১৬ সালে নিজেই কচুরিপানা থেকে নানা জিনিসপত্র তৈরি শুরু করেন। প্রথম ২০ জন নারী তাঁর অধীনে কাজ করতেন। এখন কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের মদনেরপাড়া, বাগুরিয়া, হঠাৎপাড়া, সমিতির বাজার গ্রামের ২৪৫ জন দরিদ্র নারী এই কাজ করছেন।
বাগুরিয়া গ্রামের দশম শ্রেণির ছাত্রী রিকতা খাতুন। দুই বছর ধরে পড়াশোনার ফাঁকে এই কাজ করছে সে। রিকতা জানায়, প্রতিটি ঝুড়ি সাজাতে ২০ টাকা মজুরি দেওয়া হয়। একাই দৈনিক পাঁচটি ঝুড়ি তৈরি করে আয় করে ১০০ টাকা। নিজের আয় দিয়ে লেখাপড়ার খরচ চালাতে পারে সে। মদনেরপাড়া গ্রামের জাফরিন বেগম (৩০) জানান, স্বামী দিনমজুর। যা আয় করেন, তা দিয়ে চার সদস্যের সংসার চলে না। তাই দিনের কিছু সময় কচুরিপানার জিনিসপত্র তৈরি করেন। তাতে মাসে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা আয় হয়।
বাগুরিয়া গ্রামের মোর্শেদা বেগম (৪৫) জানালেন, সংসারের কাজকর্ম সেরে অবসর সময়ে কচুরিপানা নিয়ে কাজ করেন।
সুভাষ চন্দ্র জানান, গাজীপুরের কালীগঞ্জ, বগুড়ার শেরপুর ও রংপুরের পীরগঞ্জ থেকে প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৮০ টাকা দরে কাঁচা কচুরিপানা সংগ্রহ করেন তিনি। এসব তৈরি করা জিনিসপত্র ঢাকার কচুক্ষেত এলাকার ইকো বাংলা জুট মিলস লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করেন। এই প্রতিষ্ঠানটিই পণ্যগুলো বিদেশে রপ্তানি করছে। বর্তমানে তিনি মাসে ৮ থেকে ১২ লাখ টাকার সামগ্রী বিক্রি করছেন। খরচ বাদে তাঁর মাসিক আয় হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা।
গাইবান্ধা বিসিকের সহকারী মহাব্যবস্থাপক রবিন চন্দ্র রায় বলেন, উদ্যোক্তা সুভাষ চন্দ্র চাইলে তাঁকে ঋণসহায়তা দেওয়া যেতে পারে।