
রাজধানী ঢাকার পর এবার পাশের জেলা নারায়ণগঞ্জে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এই জেলায় গতকাল রোববার পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ২৪। তাঁদের মধ্যে এ পর্যন্ত মারা গেছেন ৪৮ জন এবং ৪৭ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
সংক্রমণ ছড়ানোর কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত এই জেলার পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলছেন এখানকার স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারাও। এখানে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের অনেকে আক্রান্ত হয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতেও এই জেলায় লকডাউন পুরোপুরি কার্যকর না থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন করোনা-দুর্যোগ উত্তরণ সমন্বয় কমিটির নেতারাও। তাঁরা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সবচেয়ে খারাপ অবস্থা নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকায়। এখানে এ পর্যন্ত শনাক্ত হয়েছেন ৬৩২ জন রোগী। মারা গেছেন ৩২ জন। মহানগরের বাইরের সদর উপজেলা এলাকায় শনাক্ত হয় ২৯৯ রোগী, তাঁদের মধ্যে ১০ জন মারা গেছেন। বন্দর উপজেলায় শনাক্ত ২২ জন; মৃত্যু হয়েছে ১ জনের। রূপগঞ্জ উপজেলায় শনাক্ত ১৩ জন, মৃত্যু হয়েছে ১ জনের। আড়াইহাজার উপজেলায় গতকাল পর্যন্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন ২৮ জন। সোনারগাঁ উপজেলায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে ৩২ জনের দেহে। তাঁদের মধ্যে ২ জন মারা গেছেন।
জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ ইমতিয়াজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে আক্রান্তের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তা উদ্বেগজনক। তবে সারা দেশেই আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।’ তিনি বলেন, নতুন করে আরও চার শতাধিক ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়বে। তবে স্বস্তির খবর, নারায়ণগঞ্জে গত তিন-চার দিনে আক্রান্ত কেউ মারা যাননি।
>রাজধানীর পরই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নারায়ণগঞ্জ
এ জেলাকে ৮ এপ্রিল লকডাউন করা হয়
কিন্তু সেটা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি
এ জেলায় আক্রান্তদের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তারাও রয়েছেন। বিশেষ করে চিকিৎসাসহ সবচেয়ে সামনে থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্ত ব্যক্তিদের অনেকে ইতিমধ্যে সংক্রমিত হয়েছেন। এর মধ্যে সিভিল সার্জন, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, নারায়ণগঞ্জে সরকারি দুটি হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ১১ চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ড বয়সহ স্বাস্থ্য বিভাগেরই ৭১ জন রয়েছেন। অবশ্য এরই মধ্যে সিভিল সার্জন, সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাসহ সাতজন সুস্থ হয়েছেন। বাকিরা হাসপাতালে বা বাড়িতে আইসোলেশনে (বিচ্ছিন্ন) আছেন।
আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক দূরত্ব রক্ষায় নিয়োজিত র্যাব-পুলিশের ৯৭ জন কর্মকর্তা এবং সদস্যও আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে র্যাবের ৪ কর্মকর্তাসহ ৫৪ জন এবং পুলিশের পরিদর্শকসহ ৪৩ জন রয়েছেন। র্যাবের ১৪ জন সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল ও রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ৪১ জন ব্যাটালিয়ন কার্যালয়ে আইসোলেশনে আছেন। পুলিশের তিনজন হাসপাতালে ভর্তি। অন্যরা পুলিশ লাইনস ও বাড়িতে আইসোলেশনে আছেন। আক্রান্তদের অবস্থা ভালোর দিকে বলে জানিয়েছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। আক্রান্ত হয়েছেন জেলা প্রশাসনের তিন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটও।
করোনাবিষয়ক জেলার ফোকাল পারসন ও নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে লকডাউন কার্যকর করতে হবে। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
রাজধানীর পরই দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জেলা নারায়ণগঞ্জকে গত ৮ এপ্রিল লকডাউন (অবরুদ্ধ অবস্থা) ঘোষণা করা হয়। কিন্তু সেটা পুরোপুরি মানেনি মানুষ। জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘লকডাউন কড়াকড়ি হচ্ছে না। লকডাউন কড়াকড়ি করতে পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনীকে বলা হয়েছে।’ তিনি বলেন, যেকোনো মূল্যে লোকজনকে ঘরে রাখতে হবে। পোশাকশ্রমিকেরা কেউ যাতে অতি উৎসাহী হয়ে কারখানার বাইরে বের না হন। পোশাক কারখানাগুলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চালানো হচ্ছে কি না, সেটি দেখতে হবে।
তবে নারায়ণগঞ্জ করোনা-দুর্যোগ উত্তরণ সমন্বয় কমিটির আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখানে পর্যাপ্ত নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে না। গত ২১-২২ এপ্রিল নেওয়া নমুনার ফলাফল এখনো পাওয়া যায়নি। জেলার প্রকৃত চিত্র আমরা জানতে পারছি না।’ তিনি বলেন, অপরিকল্পিতভাবে পোশাক কারখানা খুলে দিয়ে শ্রমিকসহ সব মানুষকে ঝুঁকিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতা প্রকট। অতি দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি যেকোনো সময় আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।