মুগ আবাদ করলে ওই জমিতে পরের বছর আউশ, আমন আবাদ করলে সেখানে ইউরিয়া সারেরও প্রয়োজন হয় না।

আমন ধান ঘরে তোলার পর জমি পতিত থাকে। পতিত সেই জমিতে মুগ ডালের চাষ দক্ষিণাঞ্চলের জন্য সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। সারা দেশে মুগ ডালের ৮০ শতাংশই এখন বরিশালে উৎপাদিত হচ্ছে।
গত বছর সারা দেশে মুগ ডাল উৎপাদন হয়েছে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে বরিশাল বিভাগেই উৎপাদিত হয়েছে ৮০ ভাগের বেশি। পরিমাণে যা ২ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬০ মেট্রিক টন। চলতি বছর সারা দেশে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৫২ হাজার মেট্রিক টন। এবার আবাদ ও বাম্পার ফলন হওয়ায় বরিশাল বিভাগ থেকেই উৎপাদনের মোট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়ে যাবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।
দক্ষিণাঞ্চলে আমন ফসল ওঠার পর অধিকাংশ জমি পতিত থাকে। এই সময়ে মুগ একটি সম্ভাবনাময় ফসল। প্রতিবছরই এ অঞ্চলে মুগের আবাদ বাড়ছে।মো. আফতাব উদ্দীন, অতিরিক্ত পরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বরিশাল বিভাগ
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষিণাঞ্চলের মাটি মুগ ডাল উৎপাদনের জন্য সহায়ক। মুগ আবাদ করলে ওই জমিতে পরের বছর আউশ, আমন আবাদ করলে সেখানে ইউরিয়া সারেরও প্রয়োজন হয় না। দেশে ক্রমবর্ধমান ডালের ঘাটতি পূরণে দক্ষিণাঞ্চলে সমন্বিত ডাল চাষের উদ্যোগ নেওয়া হলে আমদানি–নির্ভরতা অনেক কমে আসতে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক যৌথ প্রতিবেদনে দেশে ডালের চাহিদার ৬০ শতাংশ ঘাটতির কথা উল্লেখ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে নাগরিকদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় মাথাপিছু ডালের চাহিদা ৪৫ গ্রাম। সে হিসাবে, দেশে বছরে ২৬ দশমিক ২৮ লাখ মেট্রিক টন ডালের চাহিদা থাকলেও দেশে সব ধরনের ডাল মিলিয়ে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৯ দশমিক ৯১ লাখ মেট্রিক টন। বাকিটা আমদানি করতে হয়।
বরিশাল আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ বলছে, গত বছর (২০১৯-২০) সারা দেশে ২ লাখ ৬৪ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে মুগ আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় আবাদ হয়েছিল ২ লাখ ১৬ হাজার ৫০৯ হেক্টর জমিতে। এতে দেশে মোট মুগ উৎপাদন হয়েছিল ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে বরিশাল বিভাগে থেকেই আসে ২ লাখ ৬৬ হাজার ৩৩০ মেট্রিক টন। এই বিভাগে সবচেয়ে বেশি আবাদ ও উৎপাদন হয় পটুয়াখালী জেলায়। দ্বিতীয় বরগুনা এবং তৃতীয় ভোলা জেলা। পটুয়াখালীতে ১ লাখ ২৬ হাজার ৫ হাজার ৯৬ হেক্টর, বরগুনায় ৫২ হাজার ৯০৭ হেক্টর এবং ভোলায় ৫০ হাজার ৮৬৭ হেক্টর জমিতে মুগ আবাদ হয়েছিল। এতে হেক্টরপ্রতি গড় ফলন হয়েছিল ১ দশমিক ২ টন।
চলতি বছর সারা দেশে মুগ আবাদ হয়েছে ২ লাখ ৭৫ হাজার ৪৪০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৫১ হাজার ৬৬২ মেট্রিক টন। এর মধ্যে বরিশাল বিভাগের ছয় জেলাতেই আবাদ হয়েছে ২ লাখ ২০ হাজার ৯৩৯ হেক্টর জমিতে। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু হয়েছে মুগ তোলার কাজ। এবার বেশি জমিতে আবাদ এবং ফলন ভালো হওয়ায় এই বিভাগে মুগের উৎপাদন তিন লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যাবে।
কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আলিমুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এটা অবশ্যই একটি বড় সাফল্য এবং সম্ভাবনার জায়গা। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে এবং কৃষি প্রযুক্তি ও উন্নত বীজ সম্প্রসারণ করতে পারলে দক্ষিণাঞ্চল থেকে মুগ উৎপাদন দ্বিগুণ করা সম্ভব।
২০১৬ সাল থেকে বরিশাল বিভাগ থেকে শুরু হয় মুগ ডাল রপ্তানি। গ্রামীণ ব্যাংক ও জাপানের ইউগ্লেনা লিমিটেড যৌথভাবে এই ডাল রপ্তানি শুরু করে। বরগুনার স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা সংগ্রাম ও ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন ও ভোলায় জন উন্নয়ন সংস্থা নামের অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই ডাল সংগ্রহ করা হয়। আর পটুয়াখালীতে গ্রামীণ-ইউগ্লেনা লিমিটেড সরাসরি এই ডাল সংগ্রহ করে।
রপ্তানিকারক সূত্র জানায়, ২০১৮ সালে বরিশাল বিভাগ থেকে প্রায় দেড় হাজার মেট্রিক টন মুগ ডাল রপ্তানি হয়েছিল। বেসরকারি সংস্থা সংগ্রামের পরিচালক মাসউদ সিকদার বলেন, জাপানে মুগ ডালের চাহিদা অনেক। সম্ভাবনার বিষয়টি মাথায় রেখে সরকারের উচিত পরিকল্পিত ও ভালো বীজ সরবরাহ করে মুগের আবাদ সম্প্রসারিত করা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক মো. আফতাব উদ্দীন বলেন, দক্ষিণাঞ্চলে আমন ফসল ওঠার পর অধিকাংশ জমি পতিত থাকে। এই সময়ে মুগ একটি সম্ভাবনাময় ফসল।