
বগুড়ার গাবতলী উপজেলার সাবেক প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আবদুল আলীমের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) কর্মসূচির ২ কোটি ৩০ লাখ ৬৯ হাজার ৭৯৯ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আজ বৃহস্পতিবার এই মামলা হয়েছে। আবদুল আলীম বর্তমানে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলায় কর্মরত।
দুদক বগুড়া সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বাদী হয়ে দুদক আইনে এই মামলা করেন। এতে পিআইও আবদুল আলীমের বিরুদ্ধে কাজ না করেই ২৯৫টি ভুয়া প্রকল্পের মাধ্যমে দুই কোটি ৩০ লাখ ৬৯ হাজার ৭৯৯ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা তৎসহ ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
গাবতলী উপজেলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪৮০টি প্রকল্পে ৩ কোটি ৭৫ লাখ ৩৭ হাজার ২৯১ টাকা বরাদ্দ দেয়। অর্থবছর শেষে ৪৭৪টি প্রকল্পের বিপরীতে ৩ কোটি ৭০ লাখ ৬৮ হাজার ৭৫ টাকা উত্তোলন করা হয়। অর্থবছর শেষে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে দ্বৈবচয়ন পদ্ধতিতে ৪৭৪টি প্রকল্পের মধ্যে ১৩০টি প্রকল্পে সরেজমিন অনুসন্ধান চালিয়ে একটিরও অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধানে ১০০ প্রকল্পের মধ্যে ৮৯টি মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির, এতিমখানা, ঈদগাহ মাঠ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ প্রকল্প এলাকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন তাঁরা এসব প্রকল্পের ব্যাপারে কিছুই জানেন না। অন্য ১১ প্রকল্প–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, প্রকল্পের কথা তাঁরা জানতেন। তবে অর্থবছরের শেষ মুহূর্তে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় থেকে তাঁদের জানানো হয়েছিল, প্রকল্পে বরাদ্দ আসেনি।
এ নিয়ে ২০১৯ সালের ১৬ জানুয়ারি ‘বগুড়ায় ভুয়া প্রকল্পে টিআর বরাদ্দ লুটপাট’ শিরোনামে প্রথম আলোতে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়। প্রতিবেদনের সূত্র ধরে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রাথমিক তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল বগুড়া জেলা প্রশাসনকে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটিও লুটপাটের সত্যতা পেয়েছিল। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছিল।
দুদক বগুড়া জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ৪৭৪টি প্রকল্পে ৩ কোটি ৭০ লাখ ৬৮ হাজার ৭৫ টাকার বরাদ্দ উত্তোলন করা হয়েছে। এর মধ্যে দুদকের অনুসন্ধানে পিআইও আবদুল আলীমের বিরুদ্ধে কাজ না করেই ২৯৫টি ভুয়া প্রকল্পের মাধ্যমে ২ কোটি ৩০ লাখ ৬৯ হাজার ৭৯৯ টাকা আত্মসাতের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে। অবশিষ্ট প্রকল্পে আরও অর্থ লোপাটের অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্তে আরও লুটপাটের তথ্য পাওয়া গেলে আলাদা মামলা হবে।
অর্থ ছাড়ের নথিতে স্বাক্ষর করা তৎকালীন গাবতলীর ইউএনওর বিরুদ্ধে মামলা না করা প্রসঙ্গে দুদকের উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, তদন্তে অন্য কারও বিরুদ্ধে অর্থ লোপাটের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাঁকেও আইনের আওতায় আনা হবে। অর্থ ছাড়ের নথিতে ইউএনও স্বাক্ষর করলেও প্রকল্পের অস্তিত্ব আছে কি না, তা সরেজমিন তদন্তের পর অর্থ ছাড় করার কথা ছিল কি না, টিআর প্রকল্পের বিধিমালা অনুসরণ করে তা তদন্ত করে দেখা হবে।
দুদকের করা মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে গাবতলী উপজেলায় টিআর প্রকল্পে দুই দফায় ৪৮০টি প্রকল্পের অনুকুলে ৩ কোটি ৭৫ লাখ ৩৭ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা আছে কি না, তা জানানোর জন্য জেলা প্রশাসক চিঠি দেন গাবতলীর ইউএনওকে। ইউএনও তথ্য প্রদানের জন্য পিআইওকে নির্দেশ দেন। পিআইও ২৮০টি প্রকল্পের মধ্যে ২৭৮টি প্রকল্পের অস্তিত্ব রয়েছে এবং আলাদা বরাদ্দপত্রের ২০০টি প্রকল্পের মধ্যে ১৯৬টি প্রকল্পের অস্তিত্ব বা প্রয়োজনীয়তা আছে জানিয়ে প্রতিবেদন দেন। এরপর জেলা প্রশাসক ওই বছরের ২৬ জুন ৪৭৪ প্রকল্পে ৩ কোটি ৭০ লাখ ৬৮ হাজার ৭৫ টাকা ইউএনও বরাবরে উপবরাদ্দ দেন।
মামলার এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রকল্পের কাজ হয়েছে কি না, তা জানাতে গাবতলীর ১১টি ইউপি চেয়ারম্যান এবং পৌরসভার মেয়রকে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। গাবতলী সদর, দুর্গাহাটা এবং নাড়ুয়ামালা ইউনিয়ন বাদে অন্যদের দাখিল করা প্রতিবেদন পর্যালোচনা এবং দ্বৈচয়ন পদ্ধতিতে প্রকল্প পরিদর্শন করে দেখা যায়, ২৯৫টি অস্তিত্বহীন প্রকল্পে কাজ না করেই ২ কোটি ৩০ লাখ ৬৯ হাজার ৭৯৯ টাকা আত্মাসাতের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে।