‘হে মহাভাগ ব্রহ্মপুত্র, হে লোহিত্য, আমার পাপ হরণ করো’—এই মন্ত্র পাঠ করে ফুল, বেলপাতা, ধান, দূর্বা, হরীতকী, ডাব, আম্রপল্লব দিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বী পুণ্যার্থীরা পাপমুক্তির বাসনায় লাঙ্গলবন্দে স্নানোৎসবে অংশ নিচ্ছেন।
গতকাল শুক্রবার রাত ৯টা ১১ মিনিট ৫৭ সেকেন্ডে লগ্ন শুরু হলেও শনিবার সকাল থেকে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার লাঙ্গলবন্দে ব্রহ্মপুত্র নদে হিন্দুধর্মাবলম্বীদের মহা অষ্টমীর স্নানোৎসবে পুণ্যার্থীদের ঢল নেমেছে। দেশ-বিদেশ থেকে আসা লাখো পুণ্যার্থীদের পদচারণে মুখরিত হয়ে ওঠে লাঙ্গলবন্দের সাড়ে তিন কিলোমিটার এলাকা। লগ্ন শেষ হবে আজ শনিবার রাত ১১টা ৮ মিনিট ৪৭ সেকেন্ডে। এবার ১৮টি ঘাটে পুণ্যার্থীরা স্নান সম্পন্ন করছেন।
লাঙ্গলবন্দ স্নানোৎসব উদ্যাপন কমিটির সভাপতি সরোজ সাহা প্রথম আলোকে বলেন, ২০০১ সালের পর থেকে এত পুণ্যার্থী দেখা যায়নি। নদের দুই পাড়ে সাড়ে তিন কিলোমিটার এলাকায় পুণ্যার্থীদের ভিড় লেগেছে। এবার পুণ্যার্থীর সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। তিনি বলেন, স্নানোৎসবে অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পুণ্যার্থীরা এসেছেন।
ঘাটগুলো হলো ললিত মোহন সাধু ঘাট, নাসিম ওসমান ঘাট, অন্নপূর্ণা ঘাট, রাজঘাট, পঞ্চপাণ্ডব ঘাট, মাকরী সাধু ঘাট, গান্ধী (মহাশ্মশান) ঘাট, ভদ্রেশ্বরী কালী ঘাট, জয়কালী মন্দির ঘাট, রক্ষাকালী মন্দির ঘাট, পাষাণকালী মন্দির ঘাট, স্বামী দীঘিজয় ব্রহ্মচারী আশ্রম প্রেমতলা ঘাট, তাজপুর-জহরপুর মুনি ঋষিপাড়া ঘাট, শ্রীরামপুর জগদ্বন্ধু (ব্রহ্মা মন্দির) ঘাট, দক্ষিণেশ্বরী কালীমন্দির ঘাট, পরেশ মহাত্মা আশ্রম ঘাট, সাব্দী রক্ষাকালী মন্দির ঘাট ও সাব্দী লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম ঘাট।
এদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও নদীপথে নৌযানে পুণ্যার্থীরা আসছেন লাঙ্গলবন্দে। পুণ্যার্থীদের ঢলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে লাঙ্গলবন্দ সেতুর দুই প্রান্তে প্রায় ২৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। স্নানোৎসব উপলক্ষে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জ থেকে পরিবারের সবাইকে নিয়ে স্নানোৎসবে এসেছেন মুক্তা দাস। তিনি বলেন, পুণ্য লাভের আশায় স্নানে অংশ নিতে এসেছেন তিনি।
কুমিল্লা থেকে আসা জয় রায় বলেন, তিনি তাঁর মা ও বোনকে নিয়ে স্নানে অংশ নিতে এসেছেন। সার্বিক আয়োজন ভালো হলেও কাপড় বদলানোর জায়গা অপ্রতুল। কনিকা রানী নামের একজন পুণ্যার্থী বলেন, এবার স্নানে প্রচুর মানুষ এসেছেন। তাঁর ধারণা, গত দুই বছর বন্ধ থাকায় এবার পুণ্যার্থী বেশি হয়েছে।
৬ নম্বর ভদ্রেশ্বরী কালীমন্দির ঘাটে পুরোহিত মঙ্গল চক্রবর্তী পুণ্যার্থীদের মন্ত্র পাঠ করাচ্ছেন। তাঁর বাড়ি গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলায়। তিনি বলেন, গত ১৬ বছর ধরে লাঙ্গলবন্দে পূজার মন্ত্র পাঠ করান তিনি। অন্যবারের চেয়ে এবার পুণ্যার্থীর সংখ্যা বেশি।
নারায়ণগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে স্নান অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। শেষ পর্যন্ত সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে স্নান সম্পন্ন হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, শনিবার দুপুর পর্যন্ত ৫ থেকে ৬ লাখ পুণ্যার্থীরা স্নানে অংশ নিয়েছেন। যেহেতু আরও সময় আছে স্নানে আরও পুণ্যার্থী অংশ নেবেন। পুণ্যার্থীদের আগমনের কারণে মহাসড়কে গাড়ির চাপ রয়েছে। স্নানের যাত্রীদের আনা গাড়িগুলোকে পার্কিংয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছে পুলিশ।