
সময় তখন সকাল ১০টা বাজতে আর পাঁচ মিনিট বাকি। যে সময় নামজের প্রস্তুতির জন্য শোলাকিয়ার ঐতিহ্য হিসেবে বন্দুকের ফাঁকা গুলি ছোড়া হতো। ঠিক সে সময়টাতে মাঠের পাশে উদাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আবদুর রহিম (৭৬)। এবারও দেশের সর্ববৃহৎ ঈদগাহ ঐতিহাসিক শোলাকিয়ায় ঈদুল ফিতরের নামাজ অনুষ্ঠিত না হওয়ায় তাঁর আক্ষেপের যেন শেষ নেই।
আবদুর রহিম প্রথম আলোকে বলেন, মাঠের পাশে বাড়ি হওয়ায় সেই ছোটবেলা থেকে প্রতি ঈদে এই মাঠে নামাজ আদায় করেছেন। গত বছর করোনা মহামারির কারণে নামাজ আদায় করতে না পারলেও এবার তিনি আশায় ছিলেন, আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে শোলাকিয়ায় নামাজ আদায় করতে পারবেন। কিন্তু না পেরে হতাশ তিনি।
করোনা মহামারির কারণে দেশের সর্ববৃহৎ শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে এবারের ঈদুল ফিতরের ১৯৪তম ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়নি। প্রতিবছর ঈদুল ফিতরে শোলাকিয়ায় ঈদগাহে স্থানীয় ব্যক্তিরাসহ দেশ–বিদেশের কয়েক লাখ মুসল্লির সমাগম ঘটে। মাঠের ঐতিহ্য আর বড় জামাতে নামাজ আদায়ে বেশি সোয়াবের আশায় মুখর থাকত শোলাকিয়া ময়দান। প্রশাসনের তৎপরতাও থাকত লক্ষ করার মতো। কিন্তু এবারের চিত্র পুরোটাই উল্টো।
আজ শুক্রবার সকালে মাঠে গিয়ে দেখা যায়, চারপাশে সুনসান নীরবতা। মাঠের বড় রেইনট্রিগাছের নিচে বসে আছেন বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য। না জেনে যেসব মুসল্লি শোলাকিয়া চলে আসেন নামাজ আদায় করতে, তাঁদের বুঝিয়ে ফিরিয়ে দিচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। স্থানীয় কয়েকজন খালি মাঠে বসে গল্প করছেন। ঈদের দিনের শোলাকিয়ার এ চিত্র বেমানান। আনোয়ার হোসেন ও শওকত আজিজ নামের স্থানীয় দুজন বলেন, কখনো চিন্তা করেননি শোলাকিয়ার জামাত ছাড়া অন্য কোথাও ঈদের নামাজ আদায় করতে হবে।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত মোতাবেক এ বছর শোলাকিয়ায় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়নি বলে জানিয়েছেন কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও ঈদগাহ মাঠ কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ শামীম আলম। জেলা প্রশাসক বলেন, এবার বড় জমায়েত পরিহার করতে সরকারি নির্দেশনা ছিল। তাই ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বড় পরিসরে ও উন্মুক্ত স্থানে ঈদের জামাত হয়নি। শহরের বিভিন্ন মসজিদে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি বজায় রেখে একাধিক জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এর আগে প্রতিবছরই ঈদ জামাতের একমাস আগে থেকেই শোলাকিয়া মাঠ নিয়ে প্রস্তুতিমূলক সভা, মাঠের সংস্কার, শোভা বর্ধন ও রঙের কাজ হতো। এ বছর কোনো ধরনের সংস্কার কাজও হয়নি।
১৮২৮ সালে এই মাঠে ঈদের জামাতে সোয়া লাখ মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করেছিলেন। সেই থেকে এ মাঠের নাম ‘সোয়া লাখিয়া’, যা এখন শোলাকিয়া নামেই পরিচিত।
বেশি সোয়াবের আশায় প্রতিবছর দূরদূরান্ত জেলাসহ দেশের বাইরে থেকে কয়েক লাখ মুসল্লি একসঙ্গে বড় জামাতে নামাজ আদায় করার জন্য এখানে আসেন। মাঠ পূর্ণ হয়ে গেলে আশপাশের সড়ক ও বাড়ির ছাদে অবস্থান নিয়ে মুসল্লিরা নামাজ আদায় করতেন।