
শেরপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা মজিবর রহমান। পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ পেতে ২০০৬ সালে তিনি ২৬ হাজার টাকা জমা দিয়েছিলেন। দীর্ঘ ১৩ বছরেও বিদ্যুতের লাইন তিনি পাননি। গতকাল বুধবার দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) গণশুনানিতে এসে নিজের এই ভোগান্তির কথা তুলে ধরেন তিনি।
শুনানিতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকা দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) সারোয়ার মাহমুদ সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিস্ট দপ্তরকে ব্যবস্থা নিতে বলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত শেরপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক মাসরুর রহমান চৌধুরী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল সাপেক্ষে সাত দিনের মধ্যে সংযোগ দেওয়ার আশ্বাস দেন।
গতকাল বুধবার দুপুরে শেরপুর সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এই গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। ‘আসুন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ হই’ স্লোগান সামনে রেখে ‘সরকারি দপ্তরে সেবা ও সুবিধাদি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে উদ্ভূত সমস্যাদি শ্রবণ ও নিষ্পত্তি এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতামূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে’ দুদকের উদ্যোগে এই গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
জেলা প্রশাসক আনার কলি মাহবুবের সভাপতিত্বে গণশুনানিতে আরও বক্তব্য দেন দুদকের পরিচালক (প্রতিরোধ ও গণসচেতনতা) মো. মনিরুজ্জামান, ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক আখতার হোসেন, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফিরোজ আল মামুন ও জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি নারায়ণ চন্দ্র।
বেলা ১১টা থেকে শুরু হয় গণশুনানি। এতে কয়েকজন সেবাগ্রহীতা লিখিত অভিযোগে বলেন, সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের এক শ্রেণির দালালচক্র জমি নিবন্ধনের সরকার নির্ধারিত ফির চেয়ে বেশি টাকা নিয়ে থাকেন। দলিলের নকল কপির জন্যও অতিরিক্ত টাকা প্রদান করতে হয়। এ ছাড়া জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে জমি নিবন্ধনের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়।
এ সময় দুদকের মহাপরিচালক সারোয়ার মাহমুদ সদরের সাব–রেজিস্ট্রারকে সচেতনতা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন এবং স্বচ্ছতার জন্য সিটিজেন চার্টারে দলিলের নিবন্ধন ফি উল্লেখ করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে গত কয়েক বছরে যেসব জমির নিবন্ধন হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে তদন্ত করার জন্য দুদকের উপপরিচালককে নির্দেশ দেন।
গণশুনানিতে সদর উপজেলার চরপক্ষীমারী গ্রামের তোজাম্মেল হক, আবদুস সাত্তারসহ কয়েকজন সেবাগ্রহীতা ভূমি কার্যালয়ের তহশিলদার শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে জমির নামজারির জন্য সরকারি ফির অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ করেন। এ বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দুদকের পরিচালক (প্রতিরোধ ও গণসচেতনতা) মো. মনিরুজ্জামান সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কর্মকর্তাকে পরামর্শ দেন।
শুনানিতে সদর উপজেলার নাঈম বাবু ও উষা রানী জেলা সদর হাসপাতালে ওষুধ সংকটের কথা এবং দালালদের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ করেন। এ সময় হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা নাহিদ কামাল এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। শুনানিতে কয়েকজন সেবাগ্রহীতা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে নানা অনিয়ম, টিআর ও কাবিখার কাজ না করে টাকা উত্তোলন এবং খাল, বিল দখল হয়ে যাওয়ার বিষয়ে অভিযোগ করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে দুদকের মহাপরিচালক সারোয়ার মাহমুদ বলেন, ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন করতে হলে একটি দুর্নীতিমুক্ত সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আমাদের দেশে যাঁরা সরকারি চাকরি করেন, তাঁদের নৈতিক লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণকে সেবা দেওয়া। জনগণের তাঁদের অধিকার আছে একজন সরকারি চাকরিজীবীর কাছ থেকে নির্দিষ্ট সেবা পাওয়া। আর সরকারি চাকরিজীবীর কর্তব্য বা দায়িত্ব হচ্ছে জনগণকে সেবা দেওয়া। আমরা আশা করব, যিনি যে পর্যায়ে আছেন, তিনি সেই পর্যায় থেকেই নীতি ও নৈতিকতার মাধ্যমে জনগণকে সেবা প্রদান করে যাবেন। তাহলে আমাদের দেশ অর্থনৈতিকভাবে একটি সমৃদ্ধিশালী দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে। আর জনগণও পাবে একটি দুর্নীতিমুক্ত সমাজ।’
দুদকের উপপরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, গতকাল সদর উপজেলার আটটি সরকারি বিভাগ সম্পর্কে ৩৪টি অভিযোগের শুনানি
অনুষ্ঠিত হয়েছে।