
পূর্ব হাজীপাড়ায় ১৫ বছর আগে সাত একর জায়গাজুড়ে উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছিল গণপূর্ত অধিদপ্তর। দুই বছরের মধ্যে এই কার্যক্রম শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এত দিন কাজের অগ্রগতি বলতে কেবল মাঠ ভরাট। প্রকল্পের কাজ থমকে আছে বহু বছর ধরে।
উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যে পড়েছে এলাকাটি। গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকল্পভুক্ত হওয়ায় সেখানে কোনো উন্নয়নকাজ করছে না ডিএনসিসি।
পূর্ব হাজীপাড়ার পেট্রলপাম্পের পেছনে ইকরা মসজিদ ও মাদ্রাসা ঘেঁষে এই প্রকল্প এলাকার খোলা মাঠ। মাঠের পূর্বে একটি সাইনবোর্ড দেওয়া আছে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নকাল ২০০৪-২০০৬ সাল পর্যন্ত উল্লেখ করা আছে। এখন সাইনবোর্ডটি বিবর্ণ হয়ে পড়েছে, লেখাও ঝাপসা হয়ে এসেছে। সাইনবোর্ডে প্রকল্পের নকশা দেওয়া আছে। প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, পূর্ব হাজীপাড়ায় ৬ দশমিক ৮৩ একর জমিতে দুটি খেলার মাঠ, ১৬ ফুট চওড়া অভ্যন্তরীণ সড়ক, এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে পানিনিষ্কাশনের জন্য ২০ ফুট চওড়া নালা, ওয়াকওয়ে, তিনটি কালভার্ট ও সীমানাপ্রাচীর তৈরির কথা ছিল।
২০০৪ সালে কাজ শুরুর কথা থাকলেও ২০০৬ সালের জুন মাসে মেসার্স সাবস সিন্ডিকেট ও মেসার্স হাসনাবাদ ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস নামের দুটি প্রতিষ্ঠান পয়োনালা তৈরি, মাটি ভরাট ও উন্নয়নকাজ বাবদ ১৪ কোটি টাকার কার্যাদেশ পায়। এ কাজের জন্য পাঁচ মাস সময় বেঁধে দেওয়া হয়।
গণপূর্তের কর্মকর্তারা বলেন, মোট বরাদ্দের এক-তৃতীয়াংশ অর্থ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। গণপূর্ত অধিদপ্তরের সার্কেল–৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী স্বর্ণেন্দু শেখর মণ্ডল প্রথম আলোকে বলেন, ২০০৫-০৬ সালে বেশ কয়েকজন ঠিকাদারকে আলাদাভাবে কাজ দেওয়া হয়। পরে অর্থ বরাদ্দ বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে কাজও বন্ধ হয়ে যায়। পরে আর বরাদ্দ আসেনি। কাজও এগোয়নি। দীর্ঘদিন সেভাবেই পড়ে আছে।
সম্প্রতি পূর্ব হাজীপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, চার থেকে ছয় ফুট গলির পথ পেরিয়ে বড় একটি খোলা মাঠ। সেখানে কোথাও কোথাও সবুজ ঘাস চোখে পড়ে। স্থানীয় ব্যক্তিরা মাচা দিয়ে শাকসবজির চাষ করেছেন। প্রকল্পের সাইনবোর্ড ঘেঁষে জলাবদ্ধ একটি জায়গা জাল দিয়ে ঘেরা। এর কাছাকাছি বসবাসকারী বাড়ির বাসিন্দারা টাকা তুলে পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে ইট ফেলে একটি সড়ক তৈরি করেছেন।
স্থানীয় ব্যক্তিরা বলেন, প্রকল্প এলাকায় অন্তত ৪০ ফুট চওড়া একটি সড়ক হওয়ার কথা ছিল। তবে প্রকল্পের কাজ না হওয়ায় রাস্তাটি আর হলো না। গণপূর্তের জায়গা বলে এখানে কোনো কাজ করছে না ডিএনসিসি। এই সড়ক তৈরি হলে এলাকাবাসীর যোগাযোগের পথ সহজ হতো। সরু গলি দিয়ে দুর্ঘটনায় বা জরুরি মুহূর্তে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি বা অ্যাম্বুলেন্স ঢুকতে পারবে না।
প্রকল্প-সংলগ্ন এক বাড়ির বাসিন্দা বলেন, ‘শহরের মধ্যেই আমরা গ্রামের চেয়েও খারাপ অবস্থায় আছি। পূর্ব হাজীপাড়ার পূর্ব অংশে গলিপথ চার থেকে ছয় ফুট চওড়া। অসুস্থ হয়ে পড়লে কাউকে হাসপাতালে নিতেও ঝামেলায় পড়তে হয়। প্রকল্প এলাকার কাজ না হওয়ায় বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা ও শীতে মশার সমস্যা প্রকট। এটি একটি বস্তি এলাকা হয়ে গেছে।’
ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোস্তাক আহমেদ বলেন, ‘এলাকাবাসীর চায় এই প্রকল্পের কাজ হোক। গণপূর্ত অধিদপ্তর জায়গাটি ডিএনসিসির কাছে হস্তান্তর করলে আমরা কাজটি করতে পারব। কিন্তু তারা নিজেরাও করছে না আবার ডিএনসিসির কাছেও বুঝিয়ে দিচ্ছে না। এলাকার মানুষের দুর্ভোগ হচ্ছে।’
উন্নয়ন প্রকল্পটির কাজের তদারকির জন্য সর্বশেষ ২০১৫ সালে ২৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির সভাপতি কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সোহরাব উদ্দিন বলেন, প্রায় সাত একর জায়গাটি ঈদগাহ ও খেলার মাঠের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এই উন্নয়ন প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ ও দেখভালের জন্য একটি কমিটি তৈরি করা হয়েছে। জায়গাটির চারপাশে দেয়াল না থাকায় আশপাশের কিছু জায়গা দখল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। সরকারের সহযোগিতা ছাড়া এই কাজ হতে পারবে না।
প্রকল্প কমিটির নির্বাহী সভাপতি কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহের ইমাম ও খতিব এবং হাজীপাড়া ইকরা মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্সের দায়িত্বে থাকা ফরিদ উদ্দীন মাসউদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রকল্পের কাজের জন্য এ পর্যন্ত তিন থেকে চারবার সভা হয়েছে। এ কাজের জন্য গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে নকশা ও পরিকল্পনা করতে বলা হয়েছে। শিগগিরই এর কাজ হবে। আর এ কাজে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকেই অর্থায়ন হবে।
আর গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তা স্বর্ণেন্দু শেখর মণ্ডল বলেন, গণপূর্ত অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন ও রাজউকের সম্মিলিত উদ্যোগে পানিনিষ্কাশনের জন্য খাল খননসহ কিছু কাজ করতে হবে। এ কাজে আগের পরিকল্পনা থেকে আরও সংশোধিত ও পরিবর্ধিত আকারে কাজ করা হবে। তবে কবে কাজ শুরু হবে, তা তিনি বলতে পারেননি।