দিনমজুর বিবি কুলসুম। স্বামী–সন্তানসহ চট্টগ্রাম নগরের বহদ্দারহাট এলাকায় থাকেন। ইট ভেঙে যতটুকু আয় হয়, তাতে নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যাওয়ার অবস্থা তাঁর। এ জন্য বাজারে কোনো মুদিপণ্যের দাম বেড়ে গেলে তা কেনা বন্ধ করে দেন বিবি কুলসুম। দাম বেড়ে যাওয়ার পর তিনি পেঁয়াজ কেনেননি। এখন দাম বেড়ে যাওয়ায় তেলের ব্যবহার কমিয়েছেন।
কুলসুম আগে এক লিটার করে তেল কিনতেন। দাম বেড়ে যাওয়ার পর আর সয়াবিন তেলের বোতল কেনেননি। সর্বশেষ ঈদের এক দিন আগে তেল কিনেছিলেন; তা–ও ৪ ছটাক (২৩৩ গ্রাম)। আজ মঙ্গলবার দুপুরে তিনি ৪৫ টাকায় ৪ ছটাক সয়াবিন তেল কেনেন। এই তেল ডিম ভাজা আর ডাল রান্নায় খরচ করবেন। আজ যা কিনলেন, তাতে বড়জোর দুই থেকে তিন দিন চলবে।
তেল শেষ হয়ে গেলে কী করেন জানতে চাইলে বিবি কুলসুম বলেন, ‘শাক, আলু সেদ্ধ করতে তেল লাগে নাকি? এক কেজি টমেটোর দাম ১৫ থেকে ২০ টাকা। টমেটো পুড়িয়ে, আলু-শাক সেদ্ধ করে ভাত খাই। তেল লাগে না। কিন্তু মাঝেমধ্যে মেয়েরা ডিমভাজি খেতে চায়। ডালও রান্না করা লাগে। এ কারণে ২০–৪০ টাকার তেল কিনে নিয়ে যাই।’
বহদ্দারহাট খাজা রোডের বাদামতল ডালবাড়ি এলাকায় থাকেন বিবি কুলসুম। বয়স ৩৫ ছুঁই ছুঁই। স্বামী সুমন মিয়া (৪০) রিকশাচালক। সুমন মিয়ার মতিগতির ঠিক নেই। কোনো দিন রিকশা নিয়ে বের হন, কোনো দিন হন না। ঘরে শুয়ে-বসে, আড্ডা দিয়ে সময় কাটান। ঘরে তাঁদের তিন মেয়ে। বাসাভাড়া গুনতে হয় চার হাজার টাকা।
বাধ্য হয়ে সংসারের ঘানি টানতে হয় কুলসুমের। পাঁচজনের সংসার। ইট ভেঙে কুলসুমের আয় হয় ২০০–৩০০ টাকা। তা দিয়েই চলে সংসার। কাজ না থাকলে আবার আয়ও বন্ধ। তিন মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে (১৮) পোশাককর্মী। চাকরি করে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা হয়। সেখান থেকে কিছু টাকা নিজের জন্য রাখেন। বাকি টাকা মায়ের হাতে তুলে দেন সংসারের খরচের জন্য। মেজ (১৩) ও ছোট (১১) মেয়েকে টাকার অভাবে পড়ালেখা করাতে পারেননি।
কুলসুম প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর জীবনে কষ্টের শেষ নেই। ভালো কিছু মেয়েদের খাওয়াতে পারেন না। ডাল, আলু, ডিম, শাক—এসব নিত্যদিনের খাবারের তালিকায় থাকে। ঈদের সময় ভালো কিছু রান্নার চেষ্টা করেন। কিন্তু টাকাপয়সা থাকে না সব সময়। এ জন্য মাঝেমধ্যে ধারদেনা করতে হয়।
চট্টগ্রামের অসচ্ছল পরিবারগুলোর মধ্যে গত ২০ মার্চ থেকে ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিক্রি শুরু করে সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। নগরের ৪১টি ওয়ার্ডে পারিবারিক কার্ডের মাধ্যমে তেল, চিনি, মসুর ডাল বিক্রি করা হয়। ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৮২টি পরিবার কার্ড পেলেও কুলসুম কার্ড পাননি বলে জানান। কীভাবে কার্ড পাবেন, তা–ও জানেন না। কেউ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। এখন যদি একটা কার্ড পান, তাহলে কম দামে তেল কিনতে পারতেন। স্বামী–সন্তানদের নিয়ে একটু পছন্দের খাবার রান্না করতেন।