
সড়কটির ৯ কিলোমিটার অংশের নির্মাণকাজ তিন বছরেও শেষ করতে পারেননি ঠিকাদার।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের একটি সড়কের দুরবস্থা নিয়ে স্থানীয় এক বাসিন্দার করা মাইকিংয়ের ভিডিও কিছুদিন আগে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি বলছিলেন, ‘গোকর্ণ ইউনিয়নের মানুষ এই নুরপুর থেকে হরিপুর পর্যন্ত যেতে পারে না। রাস্তাটার খুব বেহাল অবস্থা। বৃষ্টি হলে কাদা হয়ে যায়। স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের অনেক কষ্ট হয়।’
সড়কটি সংস্কারের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে গত ৯ আগস্ট মাইকিং করা ওই ব্যক্তির নাম সৈয়দ মৌলুদ। বিষয়টি নিয়ে তাঁর সঙ্গে গতকাল সোমবার রাতে মুঠোফোনে কথা বলার চেষ্টা করেছে প্রথম আলো। তবে তিনি কিছু বলতে চাননি। পরে মুঠোফোনে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, ‘যা বলার, আমার স্বামী ওই দিন মাইকিংয়ে বলেছেন।’
সৈয়দ মৌলুদ যে সড়ক নিয়ে মাইকিং করেছেন, সেটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলা সদরের কলেজ মোড় থেকে পূর্বভাগ ইউনিয়নের ভুবন গ্রাম পর্যন্ত। ৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ সড়কের নির্মাণকাজ তিন বছরেও শেষ হয়নি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণে নির্মাণকাজ বন্ধ আছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কাজ শেষ করতে এ নিয়ে তৃতীয় দফায় সময় বাড়ানোর আবেদন করেছেন ঠিকাদার। সড়কের বর্তমান বেহাল অবস্থার কারণে উপজেলা সদরের পাশাপাশি অন্তত তিনটি ইউনিয়নের বাসিন্দারা চলাচলের ক্ষেত্রে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।
সড়কটি নাসিরনগরের উপজেলা সদর থেকে হবিগঞ্জের মাধবপুর পর্যন্ত। এ সড়কের মোট দৈর্ঘ্য ১৮ দশমিক ১ কিলোমিটার। এর মধ্যে সংস্কারকাজ চলছে নাসিরনগর সদর থেকে উপজেলার পূর্বভাগ ইউনিয়নের ভুবন গ্রাম পর্যন্ত ৯ কিলোমিটার অংশের। এ সড়ক সংস্কারের কার্যাদেশ হয় ২০২৩ সালের ২২ নভেম্বর। কার্যাদেশের আওতায় সড়কের প্রস্থ হবে ২৪ ফুট। এর মধ্যে পাকা সড়ক হবে ১৮ ফুট, বাকি ৬ ফুট হবে মাটির রাস্তা।
নাসিরনগর সদর, গোকর্ণ, পূর্বভাগ ও হরিপুর ইউনিয়নের প্রায় ৮০ হাজার মানুষ এবং পাশের জেলা হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার লোকজনও এ সড়ক ব্যবহার করেন।
সড়কের অবস্থা খুব খারাপ। আমরা কষ্টে আছি।মিজান মিয়া, স্থানীয় বাসিন্দা
বেহাল সড়ক নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের সংসদ সদস্য ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি এম এ হান্নান জাতীয় সংসদেও বক্তব্য দিয়েছেন।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, ৯ কিলোমিটার সড়কের নাসিরনগর কলেজ মোড় থেকে ফুলপুর পর্যন্ত ৩ কিলোমিটার সড়ক কার্পেটিং করা হয়েছে। ফুলপুর সেতু থেকে নুরপুর সড়ক বাজারের আগপর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার ম্যাকাডাম (পুরোনো পিচ তুলে ইটের খোয়া ফেলা) করা। নুরপুর সড়ক বাজারের প্রায় ২০০ মিটার অংশ ঢালাই করা হয়েছে। সেখান থেকে চৈয়ারকুড়ি বাজার পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার ম্যাকাডাম করা হলেও গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে সড়কের পুরোটাই খানাখন্দ ও কাদায় ভরা। চৈয়ারকুড়ি বাজার থেকে পরবর্তী ৬ কিলোমিটার সড়কের সবটুকুই ভাঙাচোরা ও খানাখন্দে ভরপুর।
উপজেলার জেঠাগ্রামের বাসিন্দা মিজান মিয়া বলেন, ‘সড়কের অবস্থা খুব খারাপ। আমরা কষ্টে আছি।’
গাফিলতি
স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নাসিরনগর কার্যালয় সূত্র জানায়, ১৮ কোটি টাকা চুক্তিমূল্যে কাজটি পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হাসান এন্টারপ্রাইজ। এর স্বত্বাধিকারী শহরের দক্ষিণ পৈরতলার বাসিন্দা খায়রুল হাসান।
এখন বৃষ্টি-বাদলের দিন। জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই তিন মাস বৃষ্টির কারণে সড়কে কার্পেটিং বন্ধ থাকে। এ মাসের শেষের দিকে পুরোদমে কাজ শুরু করব।খায়রুল হাসান, ঠিকাদার
২০২৫ সালের সালের ২৮ মার্চ কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে তা শেষ হয়নি। এরপর ২০২৬ সালের ৪ মে পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। কিন্তু বর্ধিত সময়েও কাজ শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তৃতীয় দফায় ২০২৭ সালের ৪ মে পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এরই মধ্যে সড়কের নির্মাণ ব্যয়ের ১৮ কোটি টাকার মধ্যে ৯ কোটি ১৮ লাখ টাকা তুলেছেন ঠিকাদার। এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ৬৫ শতাংশ।
এলজিইডির দুজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ঠিকাদার প্রতি অর্থবছরের ৩০ জুন অফিসে এসে বিলের জন্য হইহুল্লোড় করেন। চাপ প্রয়োগ করে বিল নিয়ে চলে যান।
ঠিকাদার আবার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আবেদন করেছেন। এবার দ্রুত কাজ শেষ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।আবদুল মমিন, এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী
সড়ক সংস্কারে দেরি হওয়ার কারণ হিসেবে বর্ষা মৌসুমকে ‘দায়ী’ করেছেন ঠিকাদার খায়রুল হাসান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন বৃষ্টি-বাদলের দিন। জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই তিন মাস বৃষ্টির কারণে সড়কে কার্পেটিং বন্ধ থাকে। এ মাসের শেষের দিকে পুরোদমে কাজ শুরু করব।’
এক প্রশ্নের জবাবে ঠিকাদার বলেন, ‘বন বিভাগ সড়কের গাছ কাটতে দেরি করেছে। যে কারণে আমাকে কাজ বুঝিয়ে দিতে বিলম্ব করেছে। এ জন্য সড়কের কাজ সময়মতো শুরু ও শেষ করা সম্ভব হয়নি।’
তবে বেহাল সড়কের জন্য ঠিকাদারের গাফিলতিকে দায়ী করেছেন এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী আবদুল মমিন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ঠিকাদার আবার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আবেদন করেছেন। এবার দ্রুত কাজ শেষ হবে বলে তাঁরা আশা করছেন।