ময়মনসিংহ-৮ (ঈশ্বরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ
ময়মনসিংহ-৮ (ঈশ্বরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ

ডিলার নিয়োগে লেনদেনের অভিযোগ

‘পয়সার বিনিময়ে সারের লাইসেন্স দেবেন, তা হবে না’, বললেন এমপি

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে সারের ডিলার নিয়োগে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) লুৎফুল্লাহেল মাজেদ। উপজেলা থেকে পাঠানো তালিকায় প্রথম স্থানে থাকা আবেদনকারীকে বাদ দিয়ে দ্বিতীয় স্থানে থাকা আবেদনকারীকে নিয়োগ দেওয়ার কারণ জানতে চেয়েছেন তিনি। নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তি তাঁকে উৎকোচ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলেও দাবি করেছেন এই সংসদ সদস্য।

তবে জেলা প্রশাসক বলেছেন, উপজেলা থেকে পাঠানো তালিকায় কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। আর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানিয়েছেন, নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তি উপজেলা থেকে পাঠানো তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন।

আজ শুক্রবার বেলা একটার দিকে ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে এসব অভিযোগ তোলেন লুৎফুল্লাহেল মাজেদ। তিনি লেখেন, ‘সরিষা ইউনিয়নে এ রকম লাইসেন্স যখন আমাদের ত্যাগী লোকদের বাইরে যায়, আর ফ্যাসিস্টের লোক—এই প্রকৃতির টাকা নিয়ে ঘোরা লোভী মানুষ যখন সবাইকে ডিঙিয়ে লাইসেন্স পায়, তখন উপজেলা ও জেলার সততা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।’

এই সংসদ সদস্য আরও বলেন, ‘আমি সব জানি, এদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে চাইনি। কে কোথা থেকে কত পার্সেন্ট টাকা নেয়, তা আমি জানি। ...আমাদের লোকেরা মামলা-হামলা খাবে আর আপনারা পয়সার বিনিময়ে সারের লাইসেন্স দেবেন, তা হবে না। ...কিসের রাজনৈতিক নেতাদের শুদ্ধি করবেন, সবার আগে প্রশাসনের লোকদের ওপর “অপারেশন ক্লিনহার্ট” চালানো দরকার।’

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গত ৩১ আগস্ট জেলার ১৪টি উপজেলার ১৪৫টি ইউনিয়নে ১৫৬ জন সার ডিলার নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। এর মধ্যে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ১২ জন ডিলার নিয়োগ দেওয়ার কথা ছিল। জেলায় এ নিয়োগের জন্য প্রায় ১ হাজার ৭০০টি আবেদন জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত নিয়োগ দেওয়া হয়।

আজ শুক্রবার সকালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং শাখা থেকে ময়মনসিংহ জেলার ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে সার ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সুপারিশ এবং সারসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদিত তালিকায় ঈশ্বরগঞ্জের সরিষা ইউনিয়নে ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছে জিয়া এন্টারপ্রাইজ। জেলা কমিটির সুপারিশে প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল এক নম্বরে।

তবে সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ প্রথম আলোকে হোয়াটসঅ্যাপে উপজেলা থেকে জেলায় পাঠানো একটি তালিকা পাঠিয়ে দাবি করেন, সরিষা ইউনিয়নের জন্য সেখানে দুজনের নাম ছিল। প্রথম স্থানে ছিল জিওস্ট্রাক্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের মালিক তাকলিমা আক্তারের নাম। দ্বিতীয় স্থানে ছিল জিয়া এন্টারপ্রাইজের মালিক জিয়াউর রহমান ভূঁইয়ার নাম।

লুৎফুল্লাহেল মাজেদ ফেসবুক পোস্টে বলেন, ‘সব জায়গায় তালিকায় থাকা এক নম্বর ব্যক্তিকেই ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরিষা ইউনিয়নে যাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সে তালিকায় এক নম্বরে ছিল না। এখন যে নিয়োগ পেয়েছে, সে টাকা নিয়ে ঘুরেছে। ...তালিকায় থাকা দুই নম্বর ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো ইন্টারেস্ট (স্বার্থ) আছে। তা না হলে কেন এমন করা হবে? ...উপজেলা থেকে তালিকা আসলেও ডিসি এটা চেঞ্জ করেছেন, এমনকি ইউএনও তলেতলে কলকাঠি নেড়েছেন।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া জিয়াউর রহমান নিজেকে উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সদস্য বলে দাবি করেন। তিনি মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি আবেদন করার পর মুঠোফোনে কথা বলে সংসদ সদস্যের সহযোগিতা চেয়েছিলাম। কিন্তু আমি কাউকে একটি টাকাও ঘুষ দিইনি। জেলা প্রশাসনের কারও সঙ্গেও যোগাযোগ করিনি।’

এদিকে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান বলেন, ‘যিনি বাদ গেছেন, নিশ্চয়ই তাঁর কোনো ঘাটতি ছিল। তালিকায় থাকা দুই নম্বর ব্যক্তির বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দেখুন—তাঁর কী ঘাটতি ছিল। ...নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালার বাইরে কোনো কিছু করা হয়নি। সংক্ষুব্ধ যে কেউ হতেই পারে।’

ঈশ্বরগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা রহমান বলেন, ‘শুধু জেলা প্রশাসক স্যারকে মুঠোফোনে জানিয়েছিলাম, দ্বিতীয়জন আমার কাছে অভিযোগ দিয়ে গেছে প্রথমজনের আয়কর রিটার্ন নেই। নিয়োগের ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক ছিল। বিষয়টি সংসদ সদস্যকেও জানানো হয়েছিল।’