ঝালকাঠি শহর থেকে সুগন্ধা নদী পার হয়ে ওপারে পোনাবালিয়া ইউনিয়ন। কয়েক কিলোমিটার উঁচু-নিচু সড়ক পেরিয়ে কেস্তাকাঠি, নাগপাড়া হয়ে এসেছি বিষখালী নদীর তীরবর্তী দেউড়ি সাইক্লোন শেল্টারে। দেখলাম আশ্রয়কেন্দ্রটির অর্ধেকের বেশি গ্রাস করেছে খরস্রোতা বিষখালী।
গত বুধবার দুপুরে আশ্রয়কেন্দ্রটির পাশে দাঁড়িয়ে কথা হয় স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে। ঠিক আগের দিন (মঙ্গলবার) কয়েকটি বাড়ি বিলীন হয়ে যায় বিষখালীর গর্ভে। আমাকে দেখেই এগিয়ে এলেন ছয়বার নদীভাঙনের শিকার পঞ্চাশোর্ধ্ব জামাল ফরাজী। জানালেন, এখন পর্যন্ত তাঁর ২৫ বিঘার বেশি জমি এখন নদীতে। তিনি এখন ভূমিহীন।
ছোট চায়ের দোকানে বেচাবিক্রি করে সংসার চালান জামাল ফরাজী। জানালেন, ভাঙন প্রতিরোধে সর্বশেষ ১০ বছর আগে নদীর পাড়ে বালুর ব্যাগ ফেলানো হয়েছিল। তখন ভালোই ছিলেন। হতাশা আর ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, ‘এরপর কত কইরা কতজনরে কইছি একটু ব্যাগ ফালাইতে। কেউ হোনে (শোনে) নাই। এহন তো আমাগে সব শেষ। হেদিনও (সেদিন) লোকজন ভোট চাইতে আসছে। জন্মের মতো (ইচ্ছামতো) কথা হুনাইয়া দিছি। বলছি, জেতলে আর চেহারাটাও দেখা যাবে না।’
ঝালকাঠির বড় একটা অংশজুড়ে নদীভাঙন এখন কঠিন বাস্তবতা। ভোট এলে নেতারা নানা প্রতিশ্রুতি দেন। জেতার পর আর কথা রাখেন না। সবচেয়ে কম সরকারি বরাদ্দ পাওয়া জেলাগুলোর একটি ঝালকাঠি। এলাকার মানুষের অনেক মৌলিক সমস্যাও যুগ যুগ ধরে উপেক্ষিত রয়ে গেছে। ঝালকাঠির দুটি সংসদীয় আসনের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এসব নিয়ে মানুষের ক্ষোভের কথা জানা গেল।
ঝালকাঠির চারটি উপজেলা নিয়ে দুটি আসন। ভোটার ৫ লাখ ৯৩ হাজার ৮২৮ জন। প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনগুলোতে দুটি আসনেই বিএনপির শক্ত অবস্থান ছিল। তবে বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ দুটি আসনে এবার সামনে এসেছে জামায়াতে ইসলামী। আগে এখানে জামায়াত তেমন আলোচনায় ছিল না।
এবার বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল, সংখ্যালঘু ভোটার এবং এলাকার উন্নয়ন নিয়ে প্রার্থীদের ভাবনা ও প্রচেষ্টা এখানকার ভোটের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এরপর কত কইরা কতজনরে কইছি একটু ব্যাগ ফালাইতে। কেউ হোনে (শোনে) নাই। এহন তো আমাগে সব শেষ। হেদিনও (সেদিন) লোকজন ভোট চাইতে আসছে। জন্মের মতো (ইচ্ছামতো) কথা হুনাইয়া দিছি। বলছি, জেতলে আর চেহারাটাও দেখা যাবে না।জামাল ফরাজী, চা বিক্রেতা
ফসলের মাঠের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া গ্রামীণ সড়ক ধরে সাইক্লোন শেল্টার থেকে ফেরার পথে থামলাম দেউড়ি প্রাইমারি স্কুল মাঠে। পাশেই চা-বিস্কুট ও মুদিপণ্যের দোকান ‘মিম স্টোর’। ভোট নিয়ে আলাপ জমজমাট। একজন বললেন, বরিশাল অঞ্চলে পিরোজপুরের একটা ছাড়া কোনো আসনই জামায়াত পাবে না। তাঁর কথার সূত্র ধরে আরেকজন বললেন, ‘আগের হিসাব বাদ দাও। এবার ঘটনা ঘুরে যাবে। বোঝা গেল, দুই দলের সমর্থকই এখানে আছেন।’
ঝালকাঠি সদর ও নলছিটি উপজেলা নিয়ে গঠিত ঝালকাঠি-২ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপির প্রার্থী ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো এবং জামায়াতে ইসলামীর এস এম নেয়ামুল করিমের মধ্যে। নেয়ামুল বরিশাল বিএম কলেজের সাবেক এজিএস।
ইলেন ভুট্টো ২০০১ সালে এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে তাঁর স্বামী জুলফিকার আলী ভুট্টো এ আসনে জাতীয় পার্টি থেকে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। ফলে তাঁদের নিজস্ব কিছু ভোট রয়েছে।
ভোটের সার্বিক পরিস্থিতি কেমন জানতে চাইলে মিম স্টোরের মালিক আনোয়ার হোসেন জানালেন, বিএনপি-জামায়াত দুই দলের লোকই আছে। অনেক চাপা ভোট আছে। শেষ পর্যন্ত কী হয়, বলা যায় না।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এখানে আওয়ামী লীগের ভোটও গুরুত্বপূর্ণ।
একজন বললেন, বরিশাল অঞ্চলে পিরোজপুরের একটা ছাড়া কোনো আসনই জামায়াত পাবে না। তাঁর কথার সূত্র ধরে আরেকজন বললেন, ‘আগের হিসাব বাদ দাও। এবার ঘটনা ঘুরে যাবে। বোঝা গেল, দুই দলের সমর্থকই এখানে আছেন।’
শহর থেকে নেছারাবাদ পার হয়ে গাবখান ব্রিজ পেরিয়ে ধানসিঁড়ি ইউনিয়নের কিফায়েত নগর হয়ে রাজাপুর উপজেলার শুক্তাগড় ইউনিয়নে পৌঁছালাম। এটি রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত ঝালকাঠি-১ আসনের মধ্যে পড়েছে। এখানে বিএনপির প্রার্থী রফিকুল ইসলাম জামাল ও জামায়াতের ফয়জুল হক। রফিকুল ধর্মবিষয়ক সম্পাদক। আর ফয়জুল অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট। তিনি এই অঞ্চলের পরিচিত ইসলামি ব্যক্তিত্ব আল্লামা আযীযুর রহমান নেছারাবাদীর (কায়েদ ছাহেব হুজুর) নাতি।
শুক্তাগড় ইউনিয়নের পিংড়ি দিয়ে বয়ে গেছে কবি জীবনানন্দ দাশের সেই ঐতিহাসিক ধানসিঁড়ি নদী। যদিও নদীটি এখন খালের মতো হয়ে গেছে। নদীর ধারে ধান শুকাচ্ছিলেন উত্তর পিংড়ি গ্রামের ৭২ বছর বয়সী মো. আনোয়ার হোসেন। ভোট নিয়ে জিজ্ঞেস করতে তিনি বলেন, ‘আগে ভোট দিতে যাওয়ার আগেই ভোট হয়ে যেত। এবার ভোট দেব।’
ঝালকাঠি–১ আসনের অন্তত ১০ জনের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল এক ভিন্ন হিসাব। এখানে বিএনপির প্রার্থীর দলীয় প্রতীক, জামায়াতের প্রার্থীর নানার পরিচয়ের পাশাপাশি ভোটের বড় একটি হিসাব আছে বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগদান করা মুহাম্মদ শাহজাহান ওমরকে নিয়ে। তিনি তিনবারের সংসদ সদস্য ছিলেন। সর্বশেষ তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। গণ–অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর তিনি গ্রেপ্তার হন। এলাকায় আলোচনা আছে, বর্তমানে তাঁর অনুসারীরা ভোটের হিসাব-নিকাশে গুরুত্বপূর্ণ।
আনোয়ার হোসেনের পাশেই ছিলেন রাজাপুর ফাজিল মাদ্রাসায় প্রথম বর্ষে পড়া সাবিনা সুলতানা যুথী। এবার প্রথম ভোটা দেবেন তিনি। গণভোট নিয়ে জিজ্ঞেস করতে বললেন, ‘শুনেছি ১০ বছরের বেশি যাতে কেউ ক্ষমতায় থাকতে না পারে, এ জন্য “হ্যাঁ” ভোট দিতে হবে।’
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঝালকাঠিতে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে শুরু থেকে টানাপোড়েন ছিল। ঝালকাঠির দুটি আসনেই বিএনপির প্রার্থীদের মূল চ্যালেঞ্জ হবে দলের ভোট ধরে রাখা। এ ক্ষেত্রে মনোনয়নবঞ্চিতদের কাছে টানতে না পারলে রাজনৈতিক সমীকরণ কঠিন হয়ে যেতে পারে। এর বাইরে সদর উপজেলার উত্তরাঞ্চলের বড়সংখ্যক সংখ্যালঘু ভোটারের সিদ্ধান্তও নির্বাচনের হিসাব বদলে দিতে পারে।
শুক্তাগড় ইউনিয়নের পিংড়ি দিয়ে বয়ে গেছে কবি জীবনানন্দ দাশের সেই ঐতিহাসিক ধানসিঁড়ি নদী। যদিও নদীটি এখন খালের মতো হয়ে গেছে। নদীর ধারে ধান শুকাচ্ছিলেন উত্তর পিংড়ি গ্রামের ৭২ বছর বয়সী মো. আনোয়ার হোসেন। ভোট নিয়ে জিজ্ঞেস করতে তিনি বলেন, ‘আগে ভোট দিতে যাওয়ার আগেই ভোট হয়ে যেত। এবার ভোট দেব।’
পিরোজপুর থেকে ঝালকাঠি শহরে আসতে দুটি আসনেরই বড় অংশ পার হতে হয়। মঙ্গলবার যখন পিরোজপুর থেকে ঝালকাঠির রাজাপুরে ঢুকছিলাম, তখনই চোখে পড়ল ব্যানার, ফেস্টুন আর প্রার্থীদের পক্ষে মাইকিং। বোঝা গেল এই এলাকায় নির্বাচনী প্রচার তুলনামূলক জমজমাট। রাত আটটার দিকে যখন ঝালকাঠি সদরে পৌঁছে হোটেলে উঠলাম, তখনো মাইকিংয়ের শব্দ শোনা গেল। আসার পথে সড়কের দুই পাশে অনেক জায়গায় চোখে পড়ল বিভিন্ন প্রার্থীর নির্বাচনী কার্যালয়।
একটা সরপুঁটির দামও ৭৫ টাকা। গরিবের খাওয়ার মতো কিছু এহন বাজারে নাই। আলু আর শিম দিয়া রান্না করিপিয়ারা বেগম
রাত ১১টার দিকে ঝালকাঠি শহরের কামারপট্টি চৌমাথায় কথা হলো কবির হাওলাদার নামে এক রিকশাওয়ালা সঙ্গে। ভোটের কথা জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ‘এহেনে মাঠ গরম। সবাই জোরেশোরে ভোট চাইতে আছে। তয় (তবে) কোনো ঝামেলা নাই। ছোট শহর তো, সবাই সবাইরে চেনে। হেইর লইগ্যা (সেই জন্য) ঝামেলা করে না।’
পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা একজন বললেন, ‘আগে সবাই খালি আইছে, গেছে, নিজেগো প্যাট ভরছে। এলাকার জন্য কিছু করে নাই। এবার মানুষ হেইয়্যা বুইজ্জাই ভোট দেবে।’
শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ভোট নিয়ে এমন আলাপ–আলোচনা দেখা গেছে। তবে গ্রামের ভেতরে যেতেই দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। সেখানে ভোটের চেয়ে মানুষের দৈনন্দিন সংকট ও না পাওয়ার গল্পই বেশি।
দেউড়ি সাইক্লোন শেল্টারের উত্তর পাশে নদী থেকে কয়েক ফুট দূরে এক কক্ষের একটি ঘরে একাই থাকেন ৫৭-৫৮ বছর বয়সী পিয়ারা বেগম। কাছে তাঁর ভাইয়ের বাড়ি।
এহেনে মাঠ গরম। সবাই জোরেশোরে ভোট চাইতে আছে। তয় (তবে) কোনো ঝামেলা নাই। ছোট শহর তো, সবাই সবাইরে চেনে। হেইর লইগ্যা (সেই জন্য) ঝামেলা করে না।কবির হাওলাদার, রিকশাওয়ালা
দেখা গেল, পিয়ারা বেগমের জীর্ণশীর্ণ ঘরটির মধ্যেই রান্নার চুলা ও লাকরিসহ সবকিছু। এক পাশে ছোট্ট একটি চৌকিতে পাটি বিছানো। রান্না করছিলেন আর এক মনে গান গাইছিলেন। হঠাৎ যেন আমাকে দেখে চমকে উঠলেন। পরক্ষণেই হাসি দিয়ে বললেন, ‘আমারে দ্যাকতে (দেখতে) আইছেন?’
পিয়ারা বেগমকে জিজ্ঞেস করলাম কী রান্না করছেন—এবার তাঁর চোখের কোনে কিছুটা পানি দেখা গেল। কান্না লুকানোর চেষ্টা করে মুখে স্মিত হাসি রেখেই বললেন, ‘একটা সরপুঁটির দামও ৭৫ টাকা। গরিবের খাওয়ার মতো কিছু এহন বাজারে নাই। আলু আর শিম দিয়া রান্না করি।’
নদীভাঙনে আটটি ঘর বিলীন হয়ে গেছে, তাঁরটা কখন নদীতে চলে যায়, সেই আশঙ্কায় আছেন। ভোট নিয়ে কোনো কথাই বলতে চাইলেন না।
ঝালকাঠির এই নির্বাচনী বাস্তবতায় দলীয় হিসাব-নিকাশ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ও তাঁদের ক্ষোভ-প্রত্যাশাও ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে—এমনটাই মনে করছেন স্থানীয় পর্যবেক্ষকেরা।