
‘নিজের স্বপ্নগুলোই জীবনের এভারেস্ট। জীবনের এভারেস্ট জয় করতে হলে বই পড়তে হবে। পৃথিবীকে জানতে বেশি বেশি বই–পত্রিকা পড়তে হবে। নিজেকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাইলে সুশৃঙ্খল হতে হবে। মা–বাবা ও শিক্ষককে সম্মান করতে হবে। মাধ্যমিকের ফলাফলের পর উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায়ও ভালো ফল করতে হবে।’
চট্টগ্রামে শিখো–প্রথম আলো জিপিএ–৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে এমন নানা পরামর্শ ও অনুপ্রেরণামূলক কথা বলেন শিক্ষক, বিশিষ্টজন ও তারকারা। আজ রোববার নগরের ফয়’স লেক অ্যামিউজমেন্ট পার্কে এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে চট্টগ্রামের সাড়ে ছয় হাজার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থী অংশ নেয়।
‘স্বপ্ন দেখো, জীবন গড়ো’ স্লোগানে সারা দেশের ৬৪টি জেলায় প্রথম আলোর আয়োজনে ও শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু হয়েছে এসএসসিতে জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। আজ চট্টগ্রাম পর্বের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে এ বছরের আয়োজন। পর্যায়ক্রমে সারা দেশে এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হবে।
আজ সকাল ৯টার আগেই নগরের ফয়’স লেকের সামনে জড়ো হতে শুরু করে শিক্ষার্থীরা। মূল ফটক দিয়ে ঢোকার পর তাদের মধ্যে দেখা যায় উচ্ছ্বাস আর আনন্দ। কেউ ভিড় ঠেলে ছুটে যায় পার্কের বিভিন্ন রাইডে, কেউ আবার সেলফি বুথের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ভিড়ও বাড়তে থাকে। পার্কজুড়েই তখন ছিল উৎসবের আমেজ।
অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পরিবারের সঙ্গে এসেছিল তাসফিয়া জান্নাত। বাংলাদেশ মহিলা সমিতি উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এবার জিপিএ–৫ পেয়েছে সে। জানতে চাইলে তাসফিয়া বলে, ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই তার সামনে নতুন স্বপ্ন; ভবিষ্যতে চিকিৎসক হওয়া। অনুষ্ঠানে এসেছে গুণীজনদের আলাপ শুনতে। আলাপে নিজের স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা মিলবে, এমনটাই প্রত্যাশা তার।
বেলা দুইটায় জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হয় আনুষ্ঠানিকতা। শুরুতে প্রথম আলোর মহাব্যবস্থাপক ও হেড অব মার্কেটিং (মার্কেটিং ও ইভেন্টস বিভাগ) আজওয়াজ খানের সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির ব্যবসা প্রশাসন বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ জুলফিকার আলী, কনকর্ড গ্রুপের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা অনুপ কুমার সরকার ও এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের সিনিয়র পোর্টফোলিও ম্যানেজার (মার্কেটিং বিভাগ) ফারহান আহমেদ।
প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক বিশ্বজিৎ চৌধুরীর সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান কাজী তানভীর আহমেদ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মেহেরুন্নিসা, আনন্দসেবার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও উদ্যোক্তা আবিদা সুলতানা, এভারেস্টজয়ী পর্বতারোহী এম এ মুহিত ও বাবর আলী। এরপর বিশ্বজিৎ চৌধুরী শিক্ষার্থীদের মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থকে না বলতে শপথ পড়ান।
প্রথম আলো বন্ধুসভা চট্টগ্রামের উপদেষ্টা শিহাব জিশানের উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ‘শিখো’র পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন শিখোর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীর চৌধুরী ও শিখোর মেন্টররা। তাঁরা শিক্ষার্থীদের জীবনের সব ফলাফলে ভালো করার জন্য অনুপ্রেরণা দেন। শুধু মাধ্যমিকে নয়, উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পর্যায়েও ভালো করতে এখন থেকে পরিশ্রম করার পরামর্শ দেন তাঁরা।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে বক্তব্য দেন প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে টমাস আলভা এডিসনের জীবনের একটি গল্প তুলে ধরেন তিনি। অটিজমে আক্রান্ত এডিসনকে তাঁর মা কীভাবে আস্থা রেখে এগিয়ে নিয়েছিলেন, সেই গল্পের মাধ্যমে মা–বাবা ও শিক্ষকদের অবদানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে শিক্ষার্থীদের আহ্বান জানান।
সাজ্জাদ শরিফ বলেন, প্রত্যেক মানুষের সামনে একটি করে ‘এভারেস্ট’ পর্বত থাকে। সেই পর্বত পাড়ি দিতে অর্থাৎ লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য প্রথম আলো, কিশোর আলো ও বিজ্ঞানচিন্তা কাজ করছে। শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে ডাক্তার, প্রকৌশলী, লেখকসহ যে পেশাতেই যেতে চায়, নিজেদের লক্ষ্যকে ‘এভারেস্ট’ হিসেবে নিয়ে তা অর্জনের চেষ্টা করতে হবে।
এদিন নগরে রোদের তাপ কিছুটা বেশি ছিল। অনুষ্ঠানস্থলেই অনেকে গরমে বসে পড়ে। তবে বিকেলের দিকে মঞ্চের আশপাশের চিত্র পাল্টে যায়। মঞ্চে আসেন প্রথম আলোর হেড অব কালচারাল প্রোগ্রাম কবির বকুল। তিনি একে একে মঞ্চে ডেকে নেন জনপ্রিয় অভিনেতা খায়রুল বাসার, তৌসিফ মাহবুব ও জনপ্রিয় অভিনেত্রী কেয়া পায়েলকে। তাঁরা এসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করেন। শেষে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সেলফি তোলেন তাঁরা।
এ সময় তারকাদের কাছে নানা বিষয়ে প্রশ্ন করে শিক্ষার্থীরা। কেউ জানতে চায়, তাঁদের নতুন নাটক কবে আসবে। আবার কেউ জানতে চায়, তারকাদের শিক্ষাজীবনের ফলাফল কেমন ছিল। শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের উত্তর দেন অভিনেতা তৌসিফ মাহবুব ও অভিনেত্রী কেয়া পায়েল। অভিনেতা খায়রুল বাসার শিক্ষার্থীদের মা–বাবা ও নিজের স্বপ্নের প্রতি যত্নশীল হওয়ার এবং সেই স্বপ্ন পূরণে পরিশ্রম করার পরামর্শ দেন।
সাংস্কৃতিক পর্বের শুরুতে অনুষ্ঠানে জাদু প্রদর্শন করেন জাদুশিল্পী রাজীব বসাক। অনুষ্ঠানে কুইজে বিজয়ী ১০ শিক্ষার্থীকে পুরস্কার তুলে দেন তারকারা। অভিনেতাদের বক্তব্যের পর মঞ্চে আসেন সংগীতশিল্পী তানভীর ইভান। তিনি মঞ্চে এসে তাঁর সাম্প্রতিক সময়ে রিলিজ পাওয়া গান ‘আকাশ’ গেয়ে শোনান। তাঁর সঙ্গে যোগ দেয় উপস্থিত শিক্ষার্থীরা। আয়োজনের শেষে মঞ্চ মাতায় ব্যান্ড তিরন্দাজ।
এবারের আয়োজনটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ এবং সহযোগিতায় থাকছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা–গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা।