সিলেট বিভাগের চার জেলার আট শতাধিক খুদে গণিতবিদ আঞ্চলিক এ গণিত উৎসবে অংশ নিয়েছে। আজ শুক্রবার সকালে নগরের পায়রা দরগাহ মহল্লা এলাকার মুহিবুর রহমান একাডেমিতে
সিলেট বিভাগের চার জেলার আট শতাধিক খুদে গণিতবিদ আঞ্চলিক এ গণিত উৎসবে অংশ নিয়েছে। আজ শুক্রবার সকালে নগরের পায়রা দরগাহ মহল্লা এলাকার মুহিবুর রহমান একাডেমিতে

সিলেট আঞ্চলিক গণিত উৎসব

গণিতকে পরাজিত না করা পর্যন্ত লেগে থাকার পরামর্শ

মাঘ মাসের ছুটির সকাল। ঘড়ির কাঁটা তখন আটটার ঘর পেরিয়েছে। হালকা কুয়াশা কাটতে শুরু করেছিল। সিলেট নগরের দরগাহ গেট পায়রা এলাকায় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের ভিড়। সিলেট আঞ্চলিক গণিত উৎসব ঘিরেই ছিল সেই ভিড়।

আজ শুক্রবার সিলেট নগরের পায়রা এলাকার মুহিবুর রহমান একাডেমির ক্যাম্পাসে ‘গণিত শেখো স্বপ্ন দেখো’ স্লোগানে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘ডাচ্–বাংলা ব্যাংক–প্রথম আলো গণিত উৎসব–২০২৬’ সিলেট আঞ্চলিক পর্ব। সিলেট বিভাগের চারটি জেলার প্রায় সাড়ে ৮০০ খুদে গণিতবিদ উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে আঞ্চলিক এ গণিত উৎসবে অংশ নিয়েছে।

সকাল ৯টায় জাতীয় সংগীতের সঙ্গে জাতীয় পতাকা, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা ও ডাচ্–বাংলা ব্যাংকের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে গণিত উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন মুহিবুর রহমান একাডেমির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুহিবুর রহমান, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা উত্তোলন করেন নর্থইস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের সাবেক উপাচার্য ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইলিয়াস উদ্দীন বিশ্বাস ও ডাচ্–বাংলা ব্যাংকের পতাকা উত্তোলন করেন সিলেট আম্বরখানা শাখার ব্যবস্থাপক মো. মোকাদ্দেস আলী।

উৎসবের উদ্বোধন ঘোষণা করেন সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম। শুরুতেই স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলো সিলেটের নিজস্ব প্রতিবেদক সুমনকুমার দাশ। এ সময় তিনি উৎসবে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের শুভেচ্ছা জানান। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সাবেক কোষাধ্যক্ষ আনোয়ারুল ইসলাম। সিলেট বন্ধুসভার সাংস্কৃতিক সম্পাদক প্রত্যাশা তালুকদারের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন সিলেট বন্ধুসভার সভাপতি দেব রায় সৌমেন।

উদ্বোধকের বক্তব্যে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, একটি জাতিকে এগিয়ে নিতে জ্ঞান ও বিজ্ঞানের বিকল্প নেই। জ্ঞান ও বিজ্ঞানে দক্ষতা অর্জন করতে না পারলে, বিজ্ঞানমনস্ক না হলে এগিয়ে যাওয়া যায় না। এ সময় তিনি সিঙ্গাপুরের উদাহরণ দিয়ে বলেন, সিঙ্গাপুর ছিল একসময় জেলেপল্লি। ছোট একটি আইল্যান্ড। শুধু জ্ঞান ও বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় আজ উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে। সিঙ্গাপুরের চিকিৎসাব্যবস্থা পৃথিবীর নামকরা চিকিৎসাব্যবস্থা। এর কারণ হচ্ছে, তাদের জ্ঞান ও বিজ্ঞানের পারদর্শিতা সেই জায়গায় নিয়ে গেছে।

গণিতে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা ভালো করছে মন্তব্য করে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য জিম্যাট পরীক্ষা দিতে হয়। এই পরীক্ষায় একসময় গণিত বিষয়ে নম্বর ছিল ৮০০। এর মধ্যে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা এই পরীক্ষায় ৮০০–এর মধ্যে ৮০০ নম্বরই পেত। এটি দেখে অনেক দেশের মানুষ অবাক হন। কারণ, ছোট্ট একটা গরিব দেশের শিক্ষার্থীরা গণিতে এত ভালো ফল করছে। এটি আমাদের জন্য হিস্ট্রি।’ গণিত উৎসবের মাধ্যমে আগামী দিনে শিক্ষার্থীরা গণিতে আরও ভালো করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

আঞ্চলিক গণিত উৎসবের উদ্বোধনী পর্বে উপস্থিত অতিথিরা। আজ সকালে নগরের পায়রা দরগাহ মহল্লা এলাকার মুহিবুর রহমান একাডেমিতে

মো. মোকাদ্দেস আলী বলেন, শিক্ষার আলো কীভাবে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, সেই উদ্দেশ্যেই ডাচ্–বাংলা ব্যাংক কাজ করছে। এ সময় তিনি উৎসবে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের শুভেচ্ছা জানান।

অধ্যাপক ইলিয়াস উদ্দীন বিশ্বাস বলেন, গণিত শিক্ষার্থীদের শাণিত করে। মেডিক্যাল সায়েন্সেও গণিতের প্রয়োগ আছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই গণিতের প্রয়োগ রয়েছে। গণিত অলিম্পিয়াড গণিতে আগ্রহী করতে এই উৎসবের আয়োজন করে যাচ্ছে। গণিতে যারা ভালো করে, তারা অন্য বিষয়েও ভালো করে।

গণিতকে ভয় না পেয়ে পরাজিত না করা পর্যন্ত লেগে থাকার পরামর্শ দিয়ে আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, গণিত বিষয়ে ভয় নয়, সাহস নিয়ে অর্জন করতে হবে। জীবনে সব ক্ষেত্রে গণিতের প্রয়োজন রয়েছে। গণিতের কোনো বিকল্প নেই।

গণিত উৎসবে অংশ নিতে আসা নবম শ্রেণির ছাত্রী অর্পিতা দাস ও সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ঐশী দাস নামের দুই বোনের সঙ্গে কথা হয়। তারা জানায়, দুজনেরই গণিত ভালো লাগে। গণিতের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করতে ভালো লাগে। গণিতের প্রতি ভালো লাগা থেকে বিভিন্ন অলিম্পিয়াড ও উৎসবে অংশ নেয়। এর মধ্যে ঐশী দাস গত বছর জাপানে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল ম্যাথমেটিকস অলিম্পিয়াড কম্পিটিশন অব সাউথ এশিয়া পর্বে অংশ নিয়ে সিলভার পদক পেয়েছে।

গণিতের নানা সমস্যা সমাধানে ব্যস্ত খুদে শিক্ষার্থীরা। আজ সকালে সিলেট নগরের পায়রা দরগাহ মহল্লা এলাকার মুহিবুর রহমান একাডেমিতে

ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র রোহান সরকার বলে, ‘গণিতের প্রবলেমগুলো ইন্টারেস্টিং (সমস্যাগুলো মজার)। কোনো প্রবলেম সলভ (সমাধান) করতে না পারলে ব্যাংকার বাবা ও শিক্ষকের সহযোগিতা নিই।’ সিলেট ক্যাডেট কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ওলিউর রহমান জানায়, গণিতের পাশাপাশি পদার্থবিজ্ঞান বিষয় ভালো লাগে। গণিতের প্রতি ভালো লাগা থেকে উৎসবে অংশ নেওয়া।

ডাচ্–বাংলা ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতায় ও প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনায় গণিত উৎসবের আয়োজন করছে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি। গণিত উৎসব সিলেট আঞ্চলিক পর্যায়ে চারটি ক্যাটাগরিতে প্রাইমারি (তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি বা সমমান), জুনিয়র (ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি বা সমমান), সেকেন্ডারি (নবম–দশম শ্রেণি) এবং হায়ার সেকেন্ডারি (একাদশ–দ্বাদশ শ্রেণি) ও সমমানের প্রায় আড়াই হাজার শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছিল। এর মধ্যে প্রাথমিকভাবে অনলাইনে পরীক্ষার মাধ্যমে ৮৪৬ শিক্ষার্থী আঞ্চলিক উৎসবে অংশ নিয়েছে। আঞ্চলিক পর্যায় থেকে নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা পরবর্তী সময় জাতীয় পর্যায়ে অংশ নেবে। আজ অনুষ্ঠিত উৎসবের পরীক্ষার ফলাফল পরবর্তী সময়ে ওয়েবসাইটে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা।