
বাঘ, সিংহ, হরিণ, ঘোড়া, হাতি, পেঙ্গুইন, ডলফিন, ক্যাঙারু—এমন অন্তত ৫০টি প্রাণীর কৃত্রিম ভাস্কর্য ঘিরে শিশুরা মেতে থাকে হাসি-আনন্দে।
পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার কাশিনাথপুর বাজারে ঢুকলেই চোখে পড়ে এক ভিন্ন দৃশ্য। দোকানপাটের ভিড়, ক্রেতাদের কোলাহল আর পাবনা-ঢাকা মহাসড়কের যানবাহনের ভিড়ের মধ্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে একটি তিনতলা ভবন—‘জহির সুপার মার্কেট’।
ভবনটির আকর্ষণ এর দোকানে নয়, বরং এর ছাদে। সেখানে ছড়িয়ে আছে এক ছোট্ট স্বপ্নের জগৎ। সবার কাছে যা ‘কৃত্রিম শিশুপার্ক ও জাদুঘর’ নামে পরিচিত। এটি এখন আশপাশের প্রায় ৪০ গ্রামের মানুষের বিনা মূল্যের বিনোদনকেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
ছাদজুড়ে সাজানো পার্ক ও জাদুঘরটি শহরের ব্যস্ততা থেকে অনেকটা দূরে এক অন্য রকম প্রশান্তি। প্রায় তিন হাজার বর্গফুট জায়গাজুড়ে আছে শিশুদের জন্য নানা রাইড, প্রাণীর ভাস্কর্য ও হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের নিদর্শন। বাঘ, সিংহ, হরিণ, ঘোড়া, হাতি, পেঙ্গুইন, ডলফিন, ক্যাঙারু—এমন অন্তত ৫০টি প্রাণীর কৃত্রিম ভাস্কর্য ঘিরে শিশুরা মেতে থাকে হাসি-আনন্দে।
এই অনন্য কাজের উদ্যোক্তা ৭০ বছর বয়সী জহিরুল ইসলাম। কাশিনাথপুর বাজারে একসময়ের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ছিলেন তিনি। ব্যবসা থেকে অবসর নেওয়ার পর সমাজের জন্য কিছু করার ইচ্ছা থেকেই তিনি এই পার্ক ও জাদুঘর গড়ে তুলেছেন নিজের তিনতলা ভবনের ছাদে। ভবনটির প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় আছে বিভিন্ন পণ্যের দোকান। আর তৃতীয় তলায় পরিবার নিয়ে থাকেন তিনি।
জহিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি ২৪ বছর আগে ব্যবসা ছাড়ি। দেখলাম, আশপাশে শিশুদের বিনোদনের কোনো জায়গা নেই। পাবনায় কোনো জাদুঘরও নেই। তাই ভাবলাম, নিজের ছাদের জায়গাটাকেই জাদুঘর ও শিশুপার্ক করে তুলি। এই চিন্তা থেকেই এই দীর্ঘ পরিশ্রম ও কষ্টের বিনিময়ে গড়ে তুলেছি এটিকে।’
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রায় তিন হাজার বর্গফুটের ছাদজুড়ে শিশুপার্কটি সাজানো হয়েছে দৃষ্টিনন্দনভাবে। সেখানে শিশুদের খেলার সরঞ্জামের পাশাপাশি আছে ঐতিহ্যের এক বিশাল ভান্ডার। কৃষিকাজ ও গৃহস্থালি জীবনের পুরোনো সব সরঞ্জাম। এসবের মধ্যে আছে পুরোনো আমলের কলের গান, হুক্কা, মাথাল, শিঙা, রেডিও, হারিকেন, একতারা, লাঙল, দোয়াত, খড়ম, বেতের ঝুড়ি, বাঁশের টুনা—সব মিলিয়ে প্রায় ৮০০ ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী।
জহিরুল ইসলাম জানান, কোথাও পুরোনো জিনিস আছে—এমন খবর পাওয়া মাত্রই সেখানে ছুটে গিয়ে তা সংগ্রহ করা তাঁর নেশা। বহু আগে থেকেই এসব জিনিস সংগ্রহের কাজ শুরু করলেও শিশুপার্ক ও জাদুঘর করার উদ্দেশ্যে এ ধরনের পণ্য ব্যাপকভাবে সংগ্রহ করতে থাকেন ২০২০ সাল থেকে। এ জন্য দেশের দূরদূরান্তের নানা জায়গায় যেতে হয়েছে তাঁকে।
জহিরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘এখনকার শিশুরা জানে না, একসময় ঘরে আলো জ্বালাতে হারিকেন লাগত বা রেডিওতে গান শোনা হতো। তারা যেন পুরোনো বাংলাদেশকে চিনতে পারে, সেই চেষ্টাই করছি।’
জহিরুল ইসলামের শিশুপার্ক ও জাদুঘরটি প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বেলা ১টা এবং ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। প্রতিদিন গড়ে শতাধিক দর্শনার্থী এখানে ঘুরতে আসেন। এখানে ঢুকতে ও সময় কাটাতে কোনো টাকা লাগে না।
সম্প্রতি সাঁথিয়ার সোনাতলা গ্রাম থেকে স্ত্রী-সন্তানসহ বেড়াতে এসেছিলেন রফিকুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ছোট মেয়েটা শহরের পার্কে কখনো যায়নি। এখানে এনে ওর মুখের হাসি দেখে মনটা ভরে গেল। এক পয়সা খরচ না করেই এমন সুন্দর জায়গা ঘুরতে পারছি—এই সুখটা ভাষায় বোঝানো যায় না।’
কাশিনাথপুর বিজ্ঞান স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী পার্থ ও মিম জানায়, একটা ভবনের ছাদে এত সুন্দর শিশুপার্ক ও জাদুঘর হতে পারে, এখানে না এলে কেউ তা বুঝতেই পারবে না। এখানে এলে খুব ভালো লাগে।
কবি, গীতিকার ও কলেজশিক্ষক আলাউল হোসেন বলেন, ‘ছোট হলেও এই পার্ক ও জাদুঘর স্থানীয় সংস্কৃতি ও বিনোদনের এক অনন্য সংযোজন। একজন মানুষ নিঃস্বার্থভাবে নিজের ছাদে যে উদ্যোগটি নিয়েছেন, তা আমাদের সমাজে এক বিরল দৃষ্টান্ত।’