
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় মাদক সেবন, মাদকের ব্যবসা ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে ভিডিও তৈরি করায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর দ্বীন ইসলামকে (৩০) হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা। জায়গা-জমি নিয়ে আগে থেকেই হত্যাকারী ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁদের বিরোধ ছিল। দুই সপ্তাহ আগে তাঁরা থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছিলেন।
নিহত দ্বীন ইসলাম কসবা উপজেলার মেহারী ইউনিয়নের শিমরাইল গ্রামের সফিকুল ইসলামের ছেলে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউবে ‘তালাশ ক্রাইম দৃষ্টি’ নামের একটি পেজ পরিচালনা করতেন। মাদক সেবন, মাদকের ব্যবসা ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে ভিডিও তৈরি করে তিনি এলাকায় পরিচিতি লাভ করেন।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ২০ থেকে ৩০ জনের একটি দল দ্বীন ইসলামকে নিজ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর তাঁকে বেধড়ক মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে বুড়ি নদ পার করে কুমিল্লার বাঙ্গরা থানার গাঙ্গেরকুট এলাকায় নদের পাড়ে ফেলে রেখে যায় তারা। স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় দ্বীন ইসলামকে কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ময়নাতদন্ত শেষে আজ বুধবার বিকেলে দ্বীন ইসলামের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কসবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজনীন সুলতানা।
নিহত দ্বীন ইসলামের বাবা সফিকুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, ‘শিমরাইল গ্রামের বাসিন্দা মেহারী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবদুল আওয়াল ও মেহারী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) প্যানেল চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে একটি দল বাড়িতে আসে। তারা ঘরে ঢুকে ভাঙচুর করে এবং ছেলে দ্বীন ইসলামকে মারধর করে। তাদের ভয়ে ছেলে ঘরের সিলিংয়ের ওপর উঠে যায়। সেখান থেকে ছেলেকে নামিয়ে বাড়ির উঠানে মারধর করতে থাকে। ছেলের চিৎকার শুনে আমি বাড়িতে আসি। অনেক অনুনয় করলেও তারা ছেলেকে ছাড়েনি। তারা একটি অটোতে (ইজিবাইক) তাকে তুলে আওয়ালের বাড়ির রাস্তার সামনে দিয়ে মুরাদনগরের দিকে নিয়ে যায়। ছেলেকে বাঁচাতে আমার দুই মেয়ে পেছনে পেছনে দৌড় দেয়। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।’
সফিকুল ইসলাম আরও বলেন, তাঁর ছেলে মাদকের ব্যবসা নিয়ে লেখালেখি করায় এবং লাইভে এসে বিএনপির নেতার নাম বলায় তাঁরা খেপে যান। বিএনপির নেতা আবদুল আওয়ালসহ তাঁরা ছেলেকে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন। কয়েক দিন আগে থানায় একটি জিডি করেছিলেন তাঁর স্ত্রী।
এ বিষয়ে জানতে প্যানেল চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে যোগযোগ করা হলেও মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে বিএনপি নেতা আবদুল আওয়াল বলেন, ‘দ্বীন ইসলাম খারাপ প্রকৃতির লোক ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে কসবাসহ বিভিন্ন থানায় বহু মামলা রয়েছে। আমি এর সঙ্গে জড়িত নই। ষড়যন্ত্র করে একটি চক্র আমাকে জড়িয়ে মিথ্যা এবং অপপ্রচার করছে।’
নিহত দ্বীন ইসলামের পরিবারের ওই জিডি তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন কসবা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ফারুক হোসেন। তিনি বলেন, ১১ মার্চ নিহত ব্যক্তির মা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন। সেখানে জাহাঙ্গীর আলম, আবদুল আওয়ালসহ নিহত ব্যক্তির এক মামার নামও ছিল। সাধারণ ডায়েরিতে জায়গা-জমি নিয়ে বিরোধের জেরে পরিবারের সদস্যদের হুমকির বিষয় উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু দ্বীন ইসলামকে হুমকি বা হত্যার হুমকি এমন কোনো তথ্য জিডিতে উল্লেখ ছিল না। তদন্তে নিহত ব্যক্তির মা হুমকির দিন-তারিখ ও সময় সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য দিতে পারেননি। এর প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
ওসি নাজনীন সুলতানা বলেন, এলাকার সামাজিক ও গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বের জেরে একই গ্রামের লোকজন দ্বীন ইসলামকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে মারধর করে হত্যা করেছে। যাঁরা তাঁকে তুলে নিয়ে গেছেন, তাঁরা তাঁর মামা ও আত্মীয়স্বজন। নানা সমস্যা আছে সেখানে। এ ছাড়া দ্বীন ইসলামের বিরুদ্ধে কসবা থানায় মাদক, চুরি, ডাকাতিসহ অন্তত ১০টি মামলা রয়েছে।