চুরির অপবাদে নির্যাতনের শিকার জাকিরকে উদ্ধার করে প্রথমে মাদরীপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে নেওয়া হয়। গতকাল রোববার সকালে
চুরির অপবাদে নির্যাতনের শিকার জাকিরকে উদ্ধার করে প্রথমে মাদরীপুর  ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে নেওয়া হয়। গতকাল রোববার সকালে

ঘর থেকে তুলে নিয়ে চুরির অপবাদে নির্যাতনের শিকার জাকিরের চোখ হারানোর শঙ্কা

অন্য সব দিনের মতোই গত শনিবার রাতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিজ ঘরে ঘুমিয়েছিলেন জাকির শেখ। গতকাল রোববার সকাল সাড়ে ছয়টায় হঠাৎ স্থানীয় শতাধিক ব্যক্তি জাকিরের বাড়িতে প্রবেশ করেন। ঘর থেকে তাঁকে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় বাড়ির পাশের খোলা স্থানে। সেখানে চুরির অপবাদ দিয়ে অমানবিক নির্যাতন করেন কিছু উৎসুক জনতা। তাঁর দুই চোখ খেজুরের কাঁটা আর সুই দিয়ে খুঁচিয়ে নষ্ট করে ফেলার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ পরিবারের।

জাকির শেখের (৫০) বাড়ি মাদারীপুরের সদর উপজেলার শিরখাড়া ইউনিয়নের পশ্চিমমাঠ বাঘাবাড়ি এলাকায়। চিকিৎসকের বরাত দিয়ে তাঁর পরিবার জানিয়েছে, তাঁর দুটি চোখেই ভয়াবহ ক্ষত। চোখ দুটি পুরোপুরি হারানোর শঙ্কা রয়েছে। আজ সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জাকিরের চোখে অস্ত্রোপচার করেছেন চিকিৎসক।

একই ঘটনায় পিটুনির শিকার আরও দুজন মাদারীপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন।

জাকির শেখের বড় মেয়ে এনি আক্তার (২০) প্রথম আলোকে বলেন, ‘আব্বুর অবস্থা ভালো নয়। ডাক্তার বলেছেন, তাঁর চোখের ৮০ শতাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। চোখে দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। আব্বুর চোখে বড় অপারেশন আজ হইছে। আব্বুর সঙ্গে আমি আছি। আমার আব্বুকে যারা চুরির মিথ্যে অপবাদ দিয়ে এই অবস্থা করেছে, তাদের বিচার চাই।’

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিরখাড়া ইউনিয়নের পশ্চিমমাঠ বাঘাবাড়ি এলাকার কয়েকটি বাড়িতে সম্প্রতি ছিঁচকে চুরির ঘটনা ঘটে। এরপর ‘স্থানীয় যুব সমাজের উদ্যোগে’ এলাকায় নিয়মিত পাহারায় বসেন স্থানীয় কয়েকজন যুবক। শনিবার দিবাগত রাত একটার দিকে বাবুল শিকদার (২৫) নামের এক যুবক তাঁর এক আত্মীয়ের বাড়ি যাওয়ার পথে চোর সন্দেহে স্থানীয় কয়েকজন যুবক তাঁকে আটক করেন। বাবুল একই ইউনিয়নের রায়েরকান্দি গ্রামের বাসিন্দা। খবর পেয়ে বাবুলকে উদ্ধারে তাঁর এক আত্মীয় ইস্রাফিল মাতুব্বর (৪০) গেলে তাঁকেও আটক করেন স্থানীয় লোকজন। এরপর চোর সন্দেহে দুজনকে রাতভর মারধর করা হয়। এরপর জাকির শেখের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে তুলে নিয়ে পিটুনি ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।

জাকির শেখের পরিবারের অভিযোগ, পূর্বশত্রুতার জেরে চুরির মিথ্যা অপবাদ দিয়ে জাকিরকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন স্থায়ীয় কোহিনুর মাতুব্বর, কামাল, সজীব, ওমর, শফিকুলসহ বেশ কয়েকজন ব্যক্তি।

অভিযুক্ত কোহিনুর মাতুব্বর ও কামাল হোসেন বলেন, ‘চোর সন্দেহে প্রথম যাকে ধরা হইছে, তার স্বীকারোক্তিতে ছিল জাকির শেখের নাম। এখানে চোরদের সঙ্গে আমাদের কিসের শত্রুতা। এগুলো বলে ঘটনা আড়াল করা হচ্ছে। স্থানীয় লোকজন ছিঁচকে চোরের আতঙ্কে অতিষ্ঠ হয়ে গণপিটুনি দিয়েছে। এখানে ব্যক্তিগত শত্রুতা বা ক্ষোভ থেকে কাউকে আঘাত করা হয়নি।’

ফেরিওয়ালা জাকিরকে নির্যাতনে জড়িতদের বিচার চেয়ে সন্তানদের নিয়ে স্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন। আজ সকালে মাদারীপুর শহরের একটি বাসায়

এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করে আজ সকালে মাদারীপুর শহরে একটি বাসায় সংবাদ সম্মেলন করেছেন জাকিরের স্ত্রী ঝিনুক বেগম। সেখানে বলা হয়, আহত জাকিরের পরিবারে ৯ সন্তান ও তাঁর স্ত্রী রয়েছেন। বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে ফেরি করে কসমেটিকস বিক্রি করেন জাকির। গতকাল সকালে মব তৈরি করে জাকিরকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে খেজুরগাছের কাঁটা ও সুই দিয়ে খুঁচিয়ে চোখ নষ্ট করে ফেলার চেষ্টা করা হয়।

২ থেকে ১০ বছর বয়সী ৬ সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন ঝিনুক বেগম (৪৫)। তিনি বলেন, ‘আমার ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে কার কাছে বিচার চাইতে যামু। আমার স্বামী কোনো দোষ না করেও তাকে চিরদিনের জন্য অন্ধ করে দেওয়া হইছে। দুই বছর আগে স্থানীয় মারামারির একটি ঘটনাকে কেন্দ্র কইরা ওরা আমার স্বামীরে শ্যাষ করে দিতে চাইছিল। আমার স্বামী হয়তো আর কখনো দেখতে পাইব না। সে কাজ না করলে আমরা বাঁচুম ক্যামনে। এতগুলো পোলাপান নিয়া আমি রাস্তায় নাইমা গেলাম।’

চোর সন্দেহে যাঁদের পেটানো হয়েছে, তাঁদের সম্পর্কে আগে–পরে চুরির কোনো অভিযোগ পাননি বলে জানিয়েছেন শিরখাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সোহাগ মাতুব্বর। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘গুরুতর আহত জাকির আমার ওয়ার্ডের ভোটার। সে ফেরি করে জীবন যাপন করত। তার বাবাও খুব ভালো মানুষ ছিলেন। কখনো কোনো খারাপ কাজের সঙ্গে জাকিরকে দেখি নাই। যখন উৎসুক জনতা এক হয়ে জাকিরকে ধরে মারছিল, তখন আমার কিছুই করার ছিল না। আমি যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছাই, তখন দেখি পুলিশ চলে আসছে। তারাই পরে আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালে নিয়ে যায়।’

ইউপি সদস্য সোহাগ মাতুব্বর বলেন, ‘যতটা বুঝতে পেরেছি, এখানে জাকিরের ওপর ক্ষোভটা বেশি ছিল। তাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। চোখ দুটি খেজুরের কাঁটা আর সুই দিয়ে তুলে ফেলার চেষ্টা করা হয়। তার সঙ্গে পূর্ব কোনো বিরোধ ছিল কি না, তা আমার জানা নেই।’

পশ্চিমমাঠ বাঘাবাড়ি এলাকার বাসিন্দা সজীব হোসেন বলেন, ‘যতটা শুনেছি, তারা তিনজনই চোর চক্রের সদস্য। এই চোরদের সরদার জাকির। তাই তার চোখ উৎপাটনের মতো ঘটনা স্থানীয় লোকজন করেছে। চুরি–ডাকাতি, স্থানীয় লোকজন সবাই একত্র। তবে জাকিরের সঙ্গে কারও কোনো ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব বা বিরোধ ছিল কি না, জানা নেই।’

মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘যদি কেউ পূর্বশত্রুতার জেরে জাকির শেখের দুই চোখ ক্ষতিগ্রস্ত করেন, তাহলে তাঁদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসব। চুরি করতে গিয়ে কোনো ব্যক্তি আটক হলেও তাঁকে মারধর করার কোনো সুযোগ নেই। ঘটনাটি আমরা গভীরভাবে তদন্ত করছি। এর পেছনের কারণও অনুসন্ধানের চেষ্টা করছি। কেউ যদি ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য এমন কর্মকাণ্ড করেন, তাঁদের আইনের আওতায় নিয়ে আসব।’