আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশুরা। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে
আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশুরা।  গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে

ময়মনসিংহ মেডিকেল

হাম রোগীর ৮২ ভাগই ময়মনসিংহের, অধিকাংশেরই টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি

শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলা থেকে তিন মাস বয়সী ছেলে সাহালকে নিয়ে গত ২৮ মার্চ রাতে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন নূরানী বেগম। হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে চলছে শিশুটির চিকিৎসা। ঠান্ডা-শ্বাসকষ্ট নিয়ে শেরপুর সদর হাসপাতালে চার দিন ভর্তি থাকার পর শরীরে র‍্যাশ উঠলে ময়মনসিংহে নিয়ে আসেন। নূরানী বেগম বলেন, ‘আমার সন্তানের তো হামের টিকা দেওনের বয়স হয় নাই, তার কেন হাম হইল?’

হামের টিকা নেওয়ার সময় হয়নি কিংবা টিকা নিয়েছে—দুই ধরনের রোগীই হামের লক্ষণ নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। মঙ্গলবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ৮৭টি শিশু ভর্তি ছিল। তাদের মধ্যে ৬৪টি ময়মনসিংহ জেলার, যা মোট রোগীর প্রায় ৭৩ শতাংশ। অন্যদিকে হাম শনাক্ত হওয়া রোগীদের ৮২ ভাগই এই জেলার বাসিন্দা।

মঙ্গলবার বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ঘুরে দেখা গেছে, শিশুসন্তানদের নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরা। লাইন ধরে শিশুদের নেবুলাইজ করা হচ্ছে। অক্সিজেনও দিতে হচ্ছে অনেক শিশুকে।

গাজীপুরের শ্রীপুরের নয়নপুর থেকে সাত মাস বয়সী আয়ানকে নিয়ে ২৯ মার্চ ভর্তি হন সাজেদা বেগম। শিশুকে অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়েছিল। চরম উৎকণ্ঠা নিয়ে সন্তানের পাশে বসে আছেন তিনি। সাজেদা বেগম বলেন, ‘প্রথমে ঠান্ডাকাশি ছিল। পরে হাম বের হয়। এখন ছেলেকে বুকের দুধও খাওয়াতে পারি না। দুধ খাওয়াতে গেলেই খিঁচুনি হয়।’
ময়মনসিংহ নগরের আকুয়া মড়লপাড়া এলাকার শারমিন আক্তার সাত মাস বয়সী মেয়ে সাউদা জান্নাতকে বিছানায় শুইয়ে নেবুলাইজ করছিলেন। তিনি বলেন, ‘আট দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি আছি। জ্বর, ঠান্ডা, কাশি ও শরীরে র‍্যাশ উঠেছে। আগের চেয়ে মেয়ে এখন কিছুটা ভালো।’

চিকিৎসাধীন ৭৩ ভাগ রোগী ময়মনসিংহের

হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ৮৭ জন শিশুর মধ্যে ৬৪ জন ময়মনসিংহের বাসিন্দা, যা মোট রোগীর প্রায় ৭৩ শতাংশ। এ ছাড়া জামালপুরের ৬ জন, নেত্রকোনার ৪ জন, শেরপুরের ৫ জন, কিশোরগঞ্জের ৪ জন, টাঙ্গাইলের ১ জন, সুনামগঞ্জের ১ জন ও গাজীপুরের ২ জন রোগী ভর্তি আছে।

ময়মনসিংহের ৬৪ জনের মধ্যে সদর উপজেলা ও সিটি করপোরেশন এলাকার ২৫ জন, নান্দাইলের ৪ জন, তারাকান্দার ৭ জন, ফুলবাড়িয়ার ৪ জন, হালুয়াঘাটের ৩ জন, ফুলপুরের ৬ জন, মুক্তাগাছার ৩ জন, ঈশ্বরগঞ্জের ৩ জন, ত্রিশালের ৫ জন, ধোবাউড়ার ১ জন, গফরগাঁওয়ের ১ জন, গৌরীপুরের ১ জন। এর মধ্যে হামের লক্ষণ থাকা প্রায় ৩৯ শতাংশ রোগী সদর ও সিটি করপোরেশন এলাকার।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এক-দুজন করে হামের লক্ষণ নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগে ভর্তি হতে শুরু করে। তবে মার্চের মাঝামাঝি থেকে রোগী বাড়তে থাকে। এর মধ্যে ১৭ মার্চ থেকে আজ দুপুর ১২টা পর্যন্ত ১৩১ জন রোগী ভর্তি হয়। এর মধ্যে ৫ শিশুর মৃত্যুও হয়েছে।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি হিসেবে ময়মনসিংহের সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে নিযুক্ত চিকিৎসক মো. গোলাম মোত্তাকীন প্রথম আলোকে বলেন, ১৭ মার্চ থেকে গতকাল সোমবার পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশুদের মধ্যে ১২২ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৮৫টি নমুনার পরীক্ষায় ৪৭ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। শনাক্ত শিশুদের মধ্যে ৩৯ জন ময়মনসিংহ জেলার, যা মোট শনাক্তের ৮২ শতাংশ। হাম শনাক্ত হওয়া শিশুদের মধ্যে ৩৪ শতাংশের বয়স ৬ থেকে ৯ মাস এবং ৬ মাসের কম বয়সী শিশু আছে ১৭ শতাংশ।

গোলাম মোত্তাকীন বলেন, হামের লক্ষণ নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেলে মারা যাওয়া পাঁচ শিশুর মধ্যে চারজন নমুনা সংগ্রহ করার আগেই মারা যায়। অন্যজনের হাম পজিটিভ আসেনি। মানুষের ঘনত্ব বেশি থাকায় এখানে বেশি ছড়াচ্ছে। যাদের টিকার বয়স হয়নি, তাদের সংস্পর্শে আক্রান্ত শিশুরা আসায় সংক্রমণ বাড়ছে। এ ছাড়া আবহাওয়াগত কারণেও হাতে পারে।

বেশির ভাগেরই হামের টিকার সময় হয়নি

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৮৭ জন শিশুর মধ্যে শূন্য থেকে ৬ মাস বয়সী শিশু ২৪ জন, ৭ থেকে ৯ মাস বয়সী ২৮ জন, ১০ মাস থেকে ১ বছর বয়সী ১৫ জন, ২ থেকে ৫ বছর বয়সী ১৫ জন, ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী ৫ জন ছিল। দেশে হাম প্রতিরোধের জন্য শিশুদের ৯ মাস বয়সে প্রথম টিকা দেওয়া হয়। সেই হিসাবে মোট ভর্তি থাকা শিশুর মধ্যে শূন্য থেকে ৯ মাস বয়সী শিশুর হার প্রায় ৫৯ শতাংশ। হামের টিকা পাওয়ার আগেই তারা আক্রান্ত হয়েছে।

হামের রোগীদের চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল দলের সহকারী রেজিস্ট্রার মো. মাজহারুল আমিন বলেন, মার্চের মাঝামাঝি সময় হাম উপসর্গের রোগী বাড়তে থাকে। বর্তমানে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ রোগী শরীরের র‍্যাশ, জ্বর, কাশি, চোখ দিয়ে পানি পড়া ও মুখে ঘায়ের সমস্যা নিয়ে ভর্তি হচ্ছে। তিনি বলেন, ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের হাম হওয়ার সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, বাচ্চা মায়ের কাছ থেকে হামের পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি পায়নি এবং পর্যাপ্ত বুকের দুধ খায়নি। অন্য কারণ থাকতে পারে, সেগুলো গবেষণা সাপেক্ষে বলা যাবে।

ময়মনসিংহের সিভিল সার্জন (ভারপ্রাপ্ত) ফয়সল আহ্‌মেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি গত বছরই বিষয়টি আঁচ করতে পেরেছিলাম। জনসংখ্যার তুলনায় ময়মনসিংহে যা আক্রান্ত আছে, সেটা ততটা বেশি নয়। হাম আক্রান্ত শিশুদের ৮০ শতাংশই ৯ মাসের নিচে বয়স। তাদের হামের টিকা নেওয়ারই সময় হয়নি। বাকি শিশুদের মধ্যে ১০ শতাংশ আছে ১ ডোজ পাওয়া এবং বাকি ১০ শতাংশ ২ ডোজ নিয়েছে। তিনি বলেন, গত বছর থেকেই বিভিন্ন ধরনের টিকার সংকট আছে। বর্তমানে হাম ও বিসিজি ছাড়া আর কোনো টিকা নেই। বাকি টিকাও মজুত নেই। তাঁরা সেগুলোর চাহিদা পাঠিয়েছেন। গত বছরের পরিস্থিতির ফলাফল বর্তমান অবস্থা। পরিস্থিতি সামলাতে ইতিমধ্যে উপজেলাগুলোতে তাঁরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছেন।