রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটের জন্য নিয়ে আসা এবারের লিফটও গ্রহণ করেনি কর্তৃপক্ষ। গত ২ অক্টোবর থেকে লিফটটি হাসপাতালের ভেতর পড়ে আছে
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটের জন্য নিয়ে আসা এবারের লিফটও গ্রহণ করেনি কর্তৃপক্ষ। গত ২ অক্টোবর থেকে লিফটটি হাসপাতালের ভেতর পড়ে আছে

রামেক হাসপাতাল

লিফট সরবরাহে আবারও ‘জালিয়াতি’, পড়ে আছে চার মাস ধরে

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থাপনের জন্য লিফট সরবরাহে আবারও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালের গঠিত তদন্ত কমিটি বলছে, জাপান থেকে আমদানির কথা বলা হলেও লিফটির প্রকৃত উৎস নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিভিন্ন প্যাকেজের যন্ত্রাংশ একত্র করে লিফটটি সরবরাহ করা হয়েছে। এই অনিয়মকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলছে তদন্ত কমিটি।

এ কারণে হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটে স্থাপনের জন্য গত বছরের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে সরবরাহ করা লিফটটি এখনো স্থাপন করেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। লিফটটি হাসপাতালেই পড়ে আছে। তবে গণপূর্ত বিভাগ দাবি করেছে, সরবরাহ করা লিফটের সবকিছুই দরপত্রের শর্ত ও আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী এসেছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালের একাংশের পাঁচতলায় নতুন করে আইসিইউ ইউনিট নির্মাণ করা হয়। এই নির্মাণকাজের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ১০ কোটি ৯৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা। এই প্যাকেজের মধ্যেই লিফট ধরা ছিল। ব্রাদার্স কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী সৈয়দ জাকির হোসেন এই কাজ পান। আইসিইউ ইউনিটে ফায়ার প্রটেকটেড বেড-কাম প্যাসেঞ্জার লিফট স্থাপনের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ কোটি ১৭ লাখ ৩৬ হাজার টাকা।

কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ সালে সেখানে সাধারণ প্যাসেঞ্জারস লিফট স্থাপন করে। লিফটের মান নিয়েও অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে ২০২৪ সালের ৯ মার্চ প্রথম আলোতে ‘ঠিকাদারের বিরুদ্ধে লিফট স্থাপনে অনিয়মের অভিযোগ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর গণপূর্ত অধিদপ্তর ঢাকা থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রতিবেদনে লিফটটি নিম্নমানের প্রমাণ পাওয়ায় ২০২৪ সালের জুন মাসে আগের লিফটি অপসারণ করা হয়। এরপর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২০২৫ সালের ২ অক্টোবর আরেকটি লিফট সরবরাহ করে, যা এখনো হাসপাতালে পড়ে রয়েছে।

চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে নতুন আইসিইউ ইউনিট নির্মাণ করা হয়। কিন্তু জালিয়াতির কারণে এখন পর্যন্ত এই পাঁচতলা ভবনে মুমূর্ষু রোগীদের ওঠানো–নামানোর জন্য কোনো বেড-কাম প্যাসেঞ্জারস লিফট নেই। ফলে রোগীর স্বজনদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিকল্প লিফট ও সিঁড়ি ব্যবহার করে ওঠানামা করতে হচ্ছে।

গত বছর ২ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় লিফট সরবরাহের দুই দিন পর হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটের প্রধান আবু হেনা মোস্তফা কামালকে প্রধান করে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কমিটিতে চিকিৎসক ছাড়াও গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকানিক্যাল ও ইলেকট্রিক্যাল বিভাগের একজন করে প্রতিনিধি রাখা হয়। তদন্ত শেষ করে গত ১ ডিসেম্বর প্রতিবেদন দাখিল করে কমিটি।

এরপর এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ উল ইসলাম ১৬ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব বরাবর একটি চিঠি দিয়েছেন।

পরিচালকের চিঠিতে বলা হয়েছে, রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ-২–এর নির্বাহী প্রকৌশলীর ভাষ্যমতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ব্রাদার্স কনস্ট্রাকশনের মাধ্যমে জাপানের ফুজিটেক কো. লি. থেকে লিফট আমদানি করা হয়েছে। লিফটটির বাংলাদেশি আমদানিকারক হিসেবে ‘শেল করপোরেশন বিডি’র নাম উল্লেখ করা হয়।

তদন্ত প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৯ এপ্রিল দেশের চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে লিফটটি এসে পৌঁছে বলে জানানো হয়। গত ৪ সেপ্টেম্বর অফিস আদেশের মাধ্যমে লিফটটির পোর্ট ইন্সপেকশনের জন্য কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে হাসপাতালের প্রতিনিধি হিসেবে চিকিৎসক শঙ্কর কে বিশ্বাসকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। তারপর তারা একাধিকবার পোর্ট ইন্সপেকশনের তারিখ পরিবর্তন করে অবশেষে গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ-২–এর নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, ৫ অক্টোবর পোর্টে উপস্থিত থাকতে হবে। সেই অনুযায়ী বিমান টিকিট সরবরাহ করে। কিন্তু তার আগেই ১ সেপ্টেম্বর রাতে নির্বাহী প্রকৌশলী হাসপাতালের প্রতিনিধি শংকর কে বিশ্বাসকে হঠাৎ জানান যে লিফটের সব মালামাল চট্টগ্রাম পোর্ট থেকে বের করে রাজশাহীর পথে রওনা হয়েছে, যা থেকে বোঝা যায় লিফটের পোর্ট ইন্সপেকশনের বিষয়টি সম্পূর্ণ বানোয়াট ও পূর্বপরিকল্পিত।

তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, লিফটের মূল অংশ ‘ট্রাকশন মোটর’ ও ‘কন্ট্রোল বক্স’ মূল প্যাকিং তালিকায় পাওয়া যায়নি। লিফট অর্ডারের ই-মেইল আইডির সঙ্গে ওয়েব পেজের সামঞ্জস্যতা নেই। যাচাই শেষে ই–মেইল আইডি ভুয়া পাওয়া গেছে। ই–মেইল আইডিটির সঙ্গে ওয়েব পেজের সামঞ্জস্যতা নেই। মালামাল পরিদর্শনকালে কিছু প্যাকেজ খোলা অবস্থায় পাওয়া যায়। বারকোড স্ক্যান করে ফুজিটেক পাওয়া যায়নি। প্যাকেজিং লিস্ট প্রস্তুতকারক ফুজিটেক যার ওয়েবসাইটে বাংলাদেশি সরবরাহকারী, এজেন্ট বা পরিবেশকের উল্লেখ নেই। ফুজিটেক লিফটটি উৎপাদনকারী হিসেবে প্রমাণিত নয়।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, লিফট একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ইলেকট্রনিক ডিভাইস। কোনো জানমালের অঘটন ঘটলে দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করা কঠিন হবে। ঠিকাদারের সরবরাহ করা লিফটটি স্থাপন করা যুক্তিযুক্ত হবে না বলে তদন্ত কমিটির সব সদস্য একমত হয়েছেন। তাঁরা ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করার কারণে ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে বলেও সুপারিশ করেছেন।

গণপূর্ত বিভাগের সেই নির্বাহী প্রকৌশলী আবু হায়াত মুহাম্মদ শাকিউল আজম এখন ঢাকায় রয়েছেন। এই তদন্ত প্রতিবেদনের ব্যাপারে মতামত জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এরপরে আরেকটি তদন্ত হয়েছে। তিনি সেই প্রতিবেদন দেখতে বলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গণপূর্ত বিভাগও হাসপাতালের আগেই একটি কারিগরি কমিটি করে লিফটের তদন্ত করেছে। কারিগরি কমিটির আহ্বায়ক গণপূর্ত বিভাগের ডিজাইন সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) মোহাম্মদ আব্দুল কাইয়ুম গত ২৮ জানুয়ারি নির্বাহী প্রকৌশলীকে (পিপিস) একটি চিঠি দেন। এতে তিনি লেখেন, সরবরাহ করা লিফটের সবকিছুই দরপত্রের স্পেসিফিকেশন ও আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী এসেছে। লিফট স্থাপন, কমিশনিং ও পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা নেই। তবে গণপূর্তের ওই কমিটিতে হাসপাতালের কোনো প্রতিনিধি ছিলেন না।

লিফটের বিষয়ে ঠিকাদার সৈয়দ জাকির হোসেনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।

এ ব্যাপারে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র শঙ্কর কে বিশ্বাস বলেন, বন্দরে খালাস করার আগেই পিএসআই (প্রি শিপমেন্ট ইন্সপেকশন) করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু তারা আগেই মাল নিয়ে চলে আসে। তখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সন্দেহ হয় এবং তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী লিফটটি জাপানের ফুজিটেক কোম্পানির তৈরি বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তা ছাড়া ভুয়া ই-মেইল ও ডোমেইন প্রস্তুত করে এই জালিয়াতি করা হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর বাইরে কোনো তদন্তের ব্যাপারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অবগত নয়। কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে অন্য কাউকে দিয়ে তদন্ত করার প্রশ্নই ওঠে না।