ঝড়ে উপড়ে পড়া মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবিজড়িত বটগাছটি অনেকে দেখতে আসছেন। আজ রোববার দুপুরে যশোরের কেশবপুরের কপোতাক্ষ নদের পাড়ে
ঝড়ে উপড়ে পড়া মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবিজড়িত বটগাছটি অনেকে দেখতে আসছেন। আজ রোববার দুপুরে যশোরের কেশবপুরের কপোতাক্ষ নদের পাড়ে

কবি মধুসূদনের স্মৃতিবিজড়িত বটগাছের সামনে অশ্রুসজল এলাকাবাসী

যশোরের কেশবপুরের কপোতাক্ষ নদের পাড়ে ঝড়ে উপড়ে পড়া মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবিজড়িত বটগাছটি দেখতে মানুষ ভিড় জমাচ্ছেন। অনেকে বেদনাহত, অনেকে অশ্রুসজল।

আজ রোববার সরেজমিন কবির বাড়ির পূর্ব দিকে বয়ে যাওয়া কপোতাক্ষ নদের পাড়ে গিয়ে দেখা যায়, বিশাল আকারের বটবৃক্ষটি উপড়ে পড়ে বড় একটি জায়গা দখল করে নিয়েছে। এর আশেপাশের গাছগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গাছে লাল লাল ফল ধরেছে। আশপাশের মানুষসহ অনেকেই এই গাছকে ঘিরে দুঃখ প্রকাশ করছেন।

এলাকাবাসী জানান, গাছটির শিকড়ে মাটি ছিল না বলে কালবৈশাখীতে উপড়ে পড়েছে। তাঁদের অভিযোগ, কবির স্মৃতিবিজড়িত এই গাছটি সংরক্ষণে সরকারিভাবে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। অথচ দূরদূরান্ত থেকে আসা পর্যটকেরা এই গাছ দেখতে আসতেন। তাঁরা এখানে কিছু সময় কাটাতেন। ছবি তুলতেন এবং তাঁদের আবেগ প্রকাশ করতেন। বটবৃক্ষের পাশ দিয়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী মালো সম্প্রদায়ের বসবাস। বৃক্ষের নিচে এখানে একটি নদীর ঘাটও আছে। এর তীরে একটি মন্দির আছে।

এখানকার প্রবীণ বাসিন্দা সুনীল হালদার (৭০) জানান, ঝড়ের সময় তিনি বারান্দায় বসে ছিলেন। এ সময় বিকট শব্দে গাছটি উপড়ে নদীর কূলেই পড়ে যায়। তখন তিনি চিৎকার করে আশপাশের লোকজনদের ডেকে গাছটির কাছে আসেন। দেখেন, শিকড় উপড়ে গাছটি হেলে পড়েছে গেছে। তিনি বলেন, তাঁর ঠাকুরদাদা–বাবা এই গাছ দেখেছেন। তাঁর ধারণা, এই গাছ ২৫০ বছরের পুরোনো। তিনি বলেন, এখানেই একটি বটের চারা রোপণ করবেন।

স্থানীয় বাসিন্দা মিরা হালদার (৬০) বলেন, শনিবার বেলা একটার দিকে তিনি গাছের পাশে একটি গভীর নলকূপে পানি নিতে আসেন। এ সময় প্রচণ্ড ঝড় ও বৃষ্টি হচ্ছিল। তিনি বৃষ্টির পানি থেকে বাঁচতে গাছের তলায় আশ্রয় নেন। প্রচণ্ড ঝড়ের কারণে গাছটি তখন দুলছিল এবং তিনি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন, বটগাছের শিকড় উপড়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল। তখন বৃষ্টির মধ্যে তিনি দ্রুত পানি নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হন। এ সময় বিকট শব্দে গাছটি উপড়ে পড়ে।

সাগরদাঁড়ি গ্রামের কৃষক হযরত মোড়ল (৭২) বলেন, ‘গাছটি আমাদের ছায়ার মতো কাজ করত। বিশেষ করে যাঁরা খেতে কাজ করতাম, তাঁরা গরমে কষ্ট নিবারণের জন্য এই গাছের নিচে এসে বসে থাকতাম।’

মধুসূদন গবেষক কবি খসরু পারভেজ বলেন, মধুসূদন দত্তসহ জমিদার বাড়ির লোকেরা নদীর এই ঘাট ব্যবহার করতেন। বিশেষ করে তাঁরা কলকাতা থেকে এসে এই ঘাটেই নামতেন। দীর্ঘদিন ধরে গাছটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তাঁরা দাবি জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু সেদিকে নজর না দেওয়ায় একটি ইতিহাসের পরিসমাপ্তি ঘটল।

সাগরদাঁড়ি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাস্টডিয়ান হাসানুজ্জামান বলেন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের গাছ দেখাশোনার এখতিয়ার নেই। এ কারণে এই গাছের বিষয়ে তাদের তেমন কিছু করার নেই। তবে গাছটি ভেঙে পড়ায় তিনিও মর্মাহত। তিনি বলেন, ওই স্থানে আরেকটি নতুন বটগাছ রোপণ করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

কেশবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেকসোনা খাতুন বলেন, ‘বটবৃক্ষটি কালবৈশাখীতে ভেঙে পড়ায় আমরা মর্মাহত। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী গাছটি নিলাম প্রক্রিয়ায় বিক্রি করে টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে দেওয়া হবে। আর যেহেতু মানুষের আবেগ–অনুভূতি এই গাছকে ঘিরে আছে, সে কারণে সেখানে নতুন একটি বটবৃক্ষ রোপণ করা হবে।’