গ্রামের ৯৮ শতাংশ পরিবার কোনো না কোনোভাবে মাছের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। প্রায় সবাই সচ্ছল।
সবুজ পাতার ফাঁক গলে ভোরের আলো ছড়াতে শুরু করেছে লাখোহাটি গ্রামের রাস্তায়। ঘাসের গা থেকে শিশিরবিন্দু তখনো মুছে যায়নি। চারদিকে গাছ আর পুকুরে ঘেরা গ্রামটি ভোর হতে না হতেই হয়ে উঠেছে প্রাণচঞ্চল। ছায়াশীতল পথের কিছু দূর পরপরই দাঁড়িয়ে আছে গাড়ি। বড় বড় অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে করে মাছের পোনা উঠছে সেসব গাড়িতে। গাড়ি ভরলে বিভিন্ন গন্তব্যে পোনা নিয়ে যাচ্ছেন ব্যাপারীরা।
খুলনা নগরের দৌলতপুরের ভৈরব নদের উত্তর পারে দিঘলিয়া উপজেলার বারাকপুর ইউনিয়নের একটি গ্রাম লাখোহাটি। গ্রামের ৯৮ শতাংশ পরিবার কোনো না কোনোভাবে মাছের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। কেউ নিজের পুকুরে, আবার কেউ ইজারা নিয়ে মাছ চাষ করেন। কেউ জাল টেনে সেই মাছ ধরে দেন, কেউ ফড়িয়া, কেউ আড়তদার, কেউ মাছের হাঁড়িতে-ড্রামে পানি দেওয়ার ব্যবসা করেন, কেউ গাড়িতে মাছ বোঝাইয়ের কাজ করেন, কেউ আবার মোকামে মোকামে মাছ পৌঁছে দেন। মাছের পোনার মাধ্যমে ওই গ্রামের মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য এসেছে। সবার হাতে এখন নগদ টাকা; ঘরে ঘরে লাখপতি। আর এই সমৃদ্ধির কারণেই মাছের গ্রাম লাখোহাটি মানুষের কাছে ‘ছোট কুয়েত’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
লাখোহাটি গ্রামে মাঝের দিকে লাখোহাটি বাজার। বাজারে একটি খাবার হোটেল চালান গণি ফারাজি। পাশাপাশি নিজেরও দুটি পুকুরে পোনার চাষ হয়। কথায় কথায় গণি ফারাজি বললেন, গ্রামটা ঘুরে দেখেন কিছু দূর পরপর ছোট ছোট মার্কেটের মতো গড়ে উঠেছে। বাড়িতে বাড়িতে আধুনিক নকশার পাকা ঘর। প্রায় বাড়িতেই টাইলস লাগানো। গত দুই বছর ভাইরাসে মাছ মারা যাওয়ায় মানুষ একটু সমস্যায় পড়েছে অবশ্য।
গ্রাম ঘুরে গণি ফারাজির কথার সত্যতা মেলে। গ্রামজুড়ে সমৃদ্ধির চিহ্ন চোখে পড়ল। লাখোহাটি মধ্যপাড়া খান মার্কেটের একটা চায়ের দোকানে বসে জনাদশেক মানুষ গল্প করছিলেন। তাঁদের একজন শেখ মোসলেম উদ্দীন, বয়স ৮৬। মোসলেম উদ্দীন জানালেন, আগে এখানে ফসলের চাষবাস ছিল। মুক্তিযুদ্ধের কিছুকাল আগে থেকে গ্রামের দু–একজন সাদা মাছের পোনা পরিচর্যার ব্যবসা শুরু করেন। এরপর একজনের দেখাদেখি আরেকজন এই পেশায় আসতে থাকেন। ফসলের চাষাবাদ কমতে থাকে। ১৫-১৬ বছর ধরে এ ব্যবসা এখন ঘরে ঘরে।
লাখোহাটি গ্রামের অন্তত ৩০ জন খামারি, ফড়িয়া ও আড়তদারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত লাখোহাটির চাষিরা যশোরের চাঁচড়া মৎস্যপল্লিসহ বিভিন্ন এলাকার হ্যাচারি থেকে ডিম পোনা ও ‘রেণু পোনা’ কেনেন। ডিম ফোটার পরের অবস্থাকে ডিম পোনা বলা হয়। ডিম পোনা কয়েক দিনের মধ্যে রেণু পোনায় পরিণত হয়। রেণু পোনা বড় হয়ে ধানের আকার হলে তাকে ‘ধানি পোনা’ বলা হয়। ধানি পোনা হাতের আঙুলের আকার ধারণ করলে তাকে ‘চারা পোনা’ বলে। ডিম পোনা ও রেণু কিনে পুকুরে পরিচর্যা শুরু হয়। ডিম পোনার পুকুর, রেণুর পুকুর, মজুত পুকুর, বিক্রির পুকুর সব আলাদা। ধানি পোনা থেকে বিক্রি শুরু হয়। তবে লাখোহাটির মাছচাষিরা রেণু পোনা থেকে শুরু করে খাওয়ার উপযোগী সব ধরনের মাছই বিক্রি করেন।
সারা বছর এ ব্যবসা থাকলেও প্রধান মৌসুম মার্চ থেকে আগস্ট। ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত মাছ ধরা বেচাবিক্রি চলে। পাইকারেরা এখান থেকে পোনা সংগ্রহ করে বরিশাল, ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটসহ পদ্মার এপারের ২১ জেলার বিভিন্ন ঘেরে, পুকুরে ও মোকামে বিক্রি করে থাকেন। মূল মৌসুমে মাছের গাড়ির জন্য বারাকপুর থেকে কামারগাতি পর্যন্ত প্রায় ছয় কিলোমিটার রাস্তায় পা রাখার জায়গা থাকে না বললেই চলে।
লাখোহাটির কামরুজ্জামান খান, মোজাফফর শেখ ও মোকারম হোসেন বলেন, ‘ডিম পোনা প্রতি কেজিতে সাত-আট লাখ আর রেণু পোনা আড়াই থেকে তিন লাখ হয়ে থাকে। এসব কিনে এনে আমরা পরিচর্যা করি। এটা আমাদের বাপ-দাদার ব্যবসা। এক মণ রেণু আড়াই মাস পরিচর্যা করলে প্রায় ২০ মণ পোনা হয়। কেজিতে ১০ হাজার হবে এমন সময় থেকে বিক্রি শুরু করে ৫টিতে কেজি হয় এ রকম পোনা বিক্রি হয়। আর এর চেয়ে বড়গুলো স্থানীয় বাজারে খাবার মাছ হিসেবে চলে যায়।’
তাঁরা বলেন, মৌসুমে প্রতিদিন কম করে হলেও ৭০-৭৫ লাখ টাকার লেনদেন হয় গ্রামে। গ্রামের প্রত্যেকের কাছে ভালো টাকাপয়সা আছে।
পোনার আড়তদার উজ্জ্বল শেখ বলেন, ‘জন্মের পর থেকে আমরা এ ব্যবসা দেখে আসছি। মূলত যাঁদের জমি, পুকুর নেই, তাঁরাই ফড়িয়া, আড়তদারি এসব ব্যবসা করেন। অনেকে মাছের ড্রামে আর হাঁড়িতে পরিষ্কার পানি দেওয়ার ব্যবসা করছেন। আমার আড়তদারি ব্যবসা। গ্রামের চাষিদের কাছ থেকে পোনা কিনে একটা পুকুরে মজুত করি। পরে সেগুলো ফড়িয়ার মাধ্যমে ব্যাপারীকে দিয়ে দিই। এতে মণপ্রতি ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা লাভ থাকে।’
সম্প্রতি যশোরের কেশবপুর থেকে আবদুস সালাম ও নারায়ণ চন্দ্র গাইন পোনা কিনতে এসেছিলেন। সঙ্গে আনা পিকআপে বিরাট বিরাট স্বচ্ছ প্লাস্টিকের ট্যাংক আর হাঁড়ি। একটা আড়ত থেকে মাছ নিয়ে তাঁরা ঝিনাইদহে যাওযার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। নারায়ণ চন্দ্র গাইন বলেন, ‘আমরা এখান থেকে সারা বছরই পোনা কিনে বিভিন্ন ঘেরে বিক্রি করি। কেজিতে ১০০টা, ৩০-৪০টা, ২০-২৫টা, ১০-১২টা এ রকম নানা গ্রেডের পোনা আছে। আমরা চাহিদা অনুযায়ী সেগুলো কিনি।’
মৎস্য অধিদপ্তরের কাছে ওই গ্রামের পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। তবে তাদের হিসাবমতে, লাখোহাটি গ্রামে ছোট–বড় মিলিয়ে প্রায় সাড়ে বারো শ পুকুর আছে। এসব পুকুরের আয়তন প্রায় ৩১৫ হেক্টর। বছরে ওই গ্রাম থেকে প্রায় এক লাখ মণ মাছ বিক্রি হয়।
দিঘলিয়া উপজেলার জ্যেষ্ঠ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ মঞ্জুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, লাখোহাটি গ্রামকে উপজেলার মৎস্যগ্রাম হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আরও ভালো করার জন্য মৎস্য বিভাগ থেকে তাদের পরামর্শ দেওয়া হয়। ওই গ্রামের পোনা খুলনা ও বরিশাল বিভাগের সব জেলা এবং ঢাকা বিভাগের কিছু জেলায় বিক্রি হয়।