
আহমেদ উল্লা দীর্ঘদিন ধরে কাতারে আছেন। দেশটির রাজধানী দোহায় তিনি গাড়ি চালান। তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান দেশে থাকেন। তাঁদের বাড়ি কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার উত্তর হাওলা গ্রামে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় চরম আতঙ্কে আছেন প্রবাসী আহমেদ উল্লা। মঙ্গলবার মুঠোফোনে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রথম যেদিন কাতারে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা হয়, সেদিন থেকেই আমরা চরম আতঙ্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। প্রথম দিন কাজে যাইনি। বাসায় থাকতেও ভয় লাগছে, কখন আবার বাসার ওপর হামলা হয়। যদিও এখন পর্যন্ত কাতারে মার্কিন ঘাঁটির বাইরে হামলা হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে কিছুই বলা যায় না, কখন কী হয়। দুই দিন ধরে কাজে যাচ্ছি। তবে সারা দিনই আতঙ্কের মধ্যে থাকি। রাতে ভয়ে ঘুম আসে না।’
শুধু আহমেদ উল্লা একা নন, বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীদের। দেশের প্রবাসী–অধ্যুষিত জেলা কুমিল্লা। এই জেলার প্রবাসীদের প্রায় ৮০ শতাংশই থাকেন মধ্যপ্রাচ্যে। ইরানে গত শনিবার হামলা শুরু করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। ইরান ও ইসরায়েল ছাড়াও লেবানন, সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান, ওমান, ইরাক ও সাইপ্রাসে হামলা হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আশপাশের দেশগুলোতেও, অর্থাৎ প্রায় পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলছে।
মঙ্গলবার মুঠোফোনে কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কুয়েতে অবস্থানরত ১০ জন প্রবাসীর সঙ্গে কথা হয়েছে প্রথম আলোর। আতঙ্ক ও উদ্বেগ নিয়ে তাঁদের দিন কাটছে। এরই মধ্যে অনেকের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, সেটি নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন তাঁরা। এই পরিস্থিতিতে দেশে থাকা প্রবাসী পরিবারের সদস্যরাও দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।
মনোহরগঞ্জ উপজেলার উত্তর হাওলা গ্রামের বাসিন্দা সালেহ আহমেদ কাতারের রাজধানী দোহার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। নির্মাণ, পরিবহন, পর্যটন ও আবাসন ব্যবসা রয়েছে তাঁর। তাঁর এসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে দুই শতাধিক বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করেন।
মঙ্গলবার দুপুরে সালেহ আহমেদ মুঠোফোনে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে আতঙ্কের পাশাপাশি চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীদের। কাতারে সরকারিভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে আপাতত জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না থাকার জন্য। আমাদের বেশির ভাগ ব্যবসাই বাইরে। শুধু অফিসের ১০-১২ জন স্টাফ কাজ করতে পারছেন। বাকিদের মধ্যে পরিবহনে যাঁরা আছেন, তাঁরা কিছু লোক কাজে যাচ্ছেন।’
সালেহ আহমেদ আরও বলেন, ‘৬ মার্চ আমার দেশে যাওয়ার জন্য টিকিট কাটা আছে। এমন পরিস্থিতিতে কী হবে, বুঝতে পারছি না। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে পরিস্থিতি কখন স্বাভাবিক হবে, সেটিও আমরা জানি না। এমন অবস্থা চলতে থাকলে প্রবাসীরা চরম সংকটে পড়তে পারেন। মার্কিন ঘাঁটিতে ইরান হামলা করলেও সেটির ধ্বংসাবশেষ বাইরে পড়ছে। এতে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বেশি ছড়াচ্ছে।’
মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ বাহরাইনের ইসা টাউন এলাকায় থাকেন মনোহরগঞ্জ উপজেলা বাইশগাঁও ইউনিয়নের ফুলপুকুরিয়া গ্রামের মো. সেলিম। সেখানে গাড়ির যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন সরঞ্জামের দোকান রয়েছে তাঁর।
মুঠোফোনে মো. সেলিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালু রেখেছি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির কারণে আগের মতো ক্রেতা নেই। বিশেষ করে আরবি (দেশটির নাগরিক) যাঁরা, তাঁরা খুব বেশি প্রয়োজন না হলে বাসা থেকে বের হচ্ছেন না। বাংলাদেশি যাঁরা আছেন, তাঁরা পেটের দায়ে অনেকটা বাধ্য হয়ে কাজে বের হচ্ছেন। আবার অনেকে কাজও পাচ্ছেন না। এরই মধ্যে বাহরাইনে এক বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। প্রবাসীরা চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। অবস্থাটা এমন হয়েছে, বাসায় থাকলেও ভয় লাগে, আবার বাইরে যেতেও ভয় লাগে।’
কুমিল্লা নগরের হাউজিং এলাকার আবু হানিফ থাকেন কুয়েতে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীরা চরম ঝুঁকিতে পড়বেন। এখানে মানুষ কাজেই বের হতে ভয় পাচ্ছেন। তিন দিনেই পরিস্থিতি আতঙ্কজনক অবস্থায় পৌঁছেছে। সামনে এভাবে চলতে থাকলে প্রবাসীদের আয়ও বন্ধ হয়ে যেতে পারে বা কমে যেতে পারে। এতে চরম সমস্যায় পড়বেন দেশে থাকা প্রবাসীদের পরিবারও।’
বাংলাদেশিদের সুরক্ষার জন্য আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রবাসীদের নিরাপদে রাখার জন্য আরও কিছু উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আমরা জেনেছি।মো. আতিকুর রহমান, সহকারী পরিচালক, কুমিল্লা জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়
মনোহরগঞ্জ উপজেলার লক্ষ্মণপুর ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার শিক্ষক আবুল কালাম আজাদের তিন ভাই থাকেন মধ্যপ্রাচ্যে তিন দেশে। বর্তমান পরিস্থিতির কারণে তাঁদের পুরো পরিবার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছে। আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় আমাদের পরিবার চরম দুশ্চিন্তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমার এক ভাই সৌদি আবর, এক ভাই কাতার, আরেক ভাই দুবাইয়ে থাকেন। তাঁদের তিনজনের স্ত্রী-সন্তানেরাও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। সামনে ঈদ; এমন পরিস্থিতিতে প্রবাসীরা ঠিকমতো কাজও করতে পারছেন না। আমরা চাই, এই যুদ্ধ বন্ধ হোক।’
কুমিল্লা জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আতিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশের মধ্যে কুমিল্লা জেলার মানুষ প্রবাসে বেশি থাকেন। এ জন্য কুমিল্লাকে প্রবাসী–অধ্যুষিত জেলা বলা হয়ে থাকে। কুমিল্লার মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশের বেশি মানুষ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রয়েছেন। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যেই আছেন প্রবাসীদের ৮০ শতাংশ। বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বাংলাদেশিদের সুরক্ষার জন্য আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রবাসীদের নিরাপদে রাখার জন্য আরও কিছু উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আমরা জেনেছি।’