বন্যার পানি সরে যাওয়ায় ঘরে ফিরে এসেছেন হাসিনা আক্তার। তবে এখনো ঘরে জমে রয়েছে নোংরা পানি ও কাদা। বাঁশখালী উপজেলার খানখানাবাদ ইউনিয়নের পশ্চিম ডোংরা এলাকায়
বন্যার পানি সরে যাওয়ায় ঘরে ফিরে এসেছেন হাসিনা আক্তার। তবে এখনো ঘরে জমে রয়েছে নোংরা পানি ও কাদা। বাঁশখালী উপজেলার খানখানাবাদ ইউনিয়নের পশ্চিম ডোংরা এলাকায়

ঘরজুড়ে কাদা আর নোংরা পানি, বন্যার পর যেভাবে বেঁচে আছেন প্রতিবন্ধী ভাই–বোন

চট্টগ্রামের বাঁশখালীর খানখানাবাদ ইউনিয়নে সাম্প্রতিক বন্যার পরও কষ্টে জীবন কাটাচ্ছেন শারীরিক প্রতিবন্ধী ভাইবোন শামসুল আলম ও হাসিনা আক্তার। বন্যার সময় প্রতিবেশীরা তাঁদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে গেলেও পানি কমার পর ফিরে এসে দেখেন ঘরজুড়ে কাদা ও নোংরা পানি। রান্নাঘর এখনো পানিতে ডুবে থাকায় খাবার রান্নাও করতে পারছেন না। দুই ভাই-বোনের পক্ষে ঘর পরিষ্কার বা স্বাভাবিক জীবনে ফেরা কঠিন হয়ে পড়েছে।

ছোট ছোট দুই কক্ষের টিনের ঘর। খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে, মধ্যবয়স্ক এক ব্যক্তি বিছানায় শুয়ে আছেন। খাটের নিচে মেঝেতে নোংরা কাদাপানি। ঘরের বাইরে উঁচু একটা জায়গায় পানি থেকে পা বাঁচিয়ে বসে আছেন কাছাকাছি বয়সের আরেক নারী। সম্পর্কে ভাই–বোন তাঁরা। বাড়ির বাসিন্দা বলতে এই দুজনই। গত সপ্তাহে ভারী বর্ষণের সময় ঢলের পানি বাড়িতে ঢুকতে শুরু করলে প্রতিবেশীরা তাঁদের দুজনকে পাশের একটি পাকা বাড়িতে নিয়ে যান। পানি সরে যাওয়ার পর গতকাল মঙ্গলবার তাঁরা ফিরে এসেছেন ঘরে।

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার খানখানাবাদ ইউনিয়নের পশ্চিম ডোংরা এলাকায় ছোট্ট টিনের ঘরে থাকেন দুই ভাই–বোন শামসুল আলম (৫৫) ও হাসিনা আক্তার (৫০)। দুই ভাই–বোনই শারীরিক প্রতিবন্ধী। এর মধ্যে ভাই শামসুল আলম হাঁটাচলাও করতে পারেন না। ছোটবেলায় তাঁদের মা মারা যান আর ২০ বছর আগে বাবা কালু মিয়াও তাঁদের এতিম করে চলে যান। এর পর থেকেই একা বাঁচার লড়াই শুরু হয় ভাই-বোনের। আত্মীয়স্বজনের সহায়তায় সংসার চলে কোনোমতে। ভাই শামসুল আলম হাঁটাচলা করতে পারেন না বলে রান্না থেকে শুরু করে ঘরের সব কাজ একাই করেন হাসিনা আক্তার। আগে ছোট একটা কুঁড়েঘরে থাকতেন তাঁরা। বছরখানেক হলো তাঁদের প্রবাসী ভাইয়ের ছেলের পাঠানো টাকায় প্রতিবেশীরা টিনের একচালা ঘর তুলে দিয়েছেন। গত সপ্তাহে সেই ঘরটি তলিয়ে যায় বন্যার পানিতে।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৭ জুলাই রাত থেকে উপজেলার খানখানাবাদ ইউনিয়নের পশ্চিম ডোংরা এলাকায় পানি বাড়তে থাকে। এরপর টানা বৃষ্টিতে পানি তলিয়ে যায় বিস্তীর্ণ এলাকা। পুরো এলাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে পানি কমে গেলেও গতকাল বিকেল পর্যন্ত হাঁটুসমান পানি ছিল পুরো খানখানাবাদের ৮০ শতাংশ জায়গায়।

গতকাল দুপুরে ঘরের সামনে কথা হয় হাসিনা আকতারের সঙ্গে। জানতে চাইলে হাসিনা আকতার বলেন, ‘আমার ভাই চলতে-ফিরতে পারেন না। তাঁকে খাইয়ে দিতে হয়। আমি নিজেও শারীরিকভাবে সুস্থ নই। সব মিলিয়ে আমাদের কষ্টের শেষ নেই।’

এবারের বন্যায় প্রতিবেশীদের কারণে প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন বলে জানালেন হাসিনা আক্তার। তিনি বলেন, ‘এলাকায় পানি বাড়তে থাকলে লোকজন আমাদের প্রতিবেশীর একটি পাকা ঘরে নিয়ে যান। ভিটা থেকে পানি নেমে গেলে আবারও ঘরে এনে দেন তাঁরা। কিন্তু ঘরে এখনো পানি। জানি না এভাবে কত দিন চলবে।’

ছোট ঘরটির রান্নার জায়গাটা এখনো পানিতে ভাসছে। চুলা জ্বালাতে না পারলে শুকনা খাবার খেয়ে থাকতে হবে বলে হাসিনা জানালেন। অল্প চাল থাকলেও চুলা নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটছে না। কাদা সরিয়ে ঘরটা গোছাবেন, সব ঠিকঠাক করবেন, সেই সামর্থ্যও নেই হাসিনার। তিনি নিজেও হাঁটাচলা করতে পারেন না ঠিকমতো। ঘরের এক কোণে বসে হাসিনা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। বলেন, ‘আল্লাহ বিপদ দিসে, আল্লাহই রক্ষা করবেন।’

হাসিনা আক্তারের প্রতিবেশী মোহাম্মদ তাহসিন প্রায় ছুটে যান ভাই-বোনের বিপদ-আপদে। তিনি বলেন, ‘ভাই–বোন দুজনই প্রতিবন্ধী। তাঁদের মধ্যে ভাইয়ের শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ। তাঁদের নিয়ে পাড়াপড়শির চিন্তার শেষ নেই। গত বছর তাঁদের জন্য ঘর তোলা হয়। এখন সেই ঘরটি বন্যার পানিতে ডুবেছে। সব মিলিয়ে তাঁরা অসহায় অবস্থায় আছেন।’

জানতে চাইলে খানখানাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. শহীদুল ইসলাম সিকদার বলেন, বন্যার পানি নেমে গেলে দুজনের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।