গাজীপুরের শ্রীপুরে গজারি বনের ভেতরে আমগাছের নিচে উন্মুক্ত জায়গায় মাদুর পেতে বসেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। গতকাল রাতে উপজেলার মাওনা ইউনিয়নের ফুলানীরছিট গ্রামে
গাজীপুরের শ্রীপুরে গজারি বনের ভেতরে আমগাছের নিচে উন্মুক্ত জায়গায় মাদুর পেতে বসেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। গতকাল রাতে উপজেলার মাওনা ইউনিয়নের ফুলানীরছিট গ্রামে

গজারি বনে লোকগানের সুরে প্রকৃতি রক্ষার অঙ্গীকার

সবুজ গালিচায় মোড়ানো নিভৃত গ্রাম ফুলানীরছিট। গোধূলির আলো মিলিয়ে যেতেই চারপাশে নামে ঘন অন্ধকার। অদূরে বয়ে চলা সালদহ নদের শীতল হাওয়া বয়ে যায় গজারি বনের ভেতর দিয়ে। পাতায় পাতায় লাগা বাতাসে তৈরি হয় ছন্দময় এক আবহ। এর মধ্যে বনের কোলে মাদুর পেতে বসানো হয়েছে এক ব্যতিক্রমী বৈঠকি আসর—যেখানে নেই যান্ত্রিক কোলাহল, নেই কৃত্রিমতার ছোঁয়া; আছে শুধু লোকগানের সুর আর প্রকৃতিকে আগলে রাখার দৃঢ় অঙ্গীকার।

গতকাল সোমবার রাতে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা ইউনিয়নের ফুলানীরছিট গ্রামে ‘লোকগানের সুরে গজারিগড়ে আড্ডা’ শিরোনামে এর আয়োজন করে পরিবেশবাদী সংগঠন ‘নদী ও প্রকৃতি ফাউন্ডেশন’।

গজারি বনের ভেতরে আমগাছের নিচে উন্মুক্ত জায়গায় মাদুর পেতে বসেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। বিদ্যুতের টিমটিমে আলোয় ভেসে ওঠে তাঁদের মুখ। কৃষক, পোশাককর্মী, শিক্ষক, লেখক, ব্যবসায়ী ও সংস্কৃতিকর্মী—সবাই বুঁদ আছেন লোকজ সুরের মায়ায়। বেজে ওঠে চেনা পল্লিগান, ফকিরি গান আর মাটির সুর। গানের প্রতিটি কলি যেন বারবার মনে করিয়ে দেয়, ‘এই নদী, এই বন কিংবা প্রকৃতিই আমাদের শিকড়।’

তবে আসরটি কেবল গানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ফাঁকে ফাঁকে আড্ডা-গল্পগুলো মোড় নেয় গভীর আলোচনায়। উঠে আসে দ্রুত ও অপরিকল্পিত শিল্পায়নের কবলে পড়া গাজীপুরের নদী ও বনাঞ্চলের বিপন্নতার কথা। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, একসময় গাজীপুর ছিল নদী ও প্রকৃতির এক অকৃত্রিম স্বর্গ; কিন্তু অপরিকল্পিত শিল্পায়নে সেই রূপ আজ ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে। যতই দিন যাচ্ছে, পরিবেশ সুরক্ষায় কার্যকর পরিকল্পনার অভাব ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন লেখক মিশকাত রাসেল। তাঁর উপস্থাপনায় এই আড্ডা রূপ নেয় এক সামাজিক সচেতনতার মঞ্চে। বক্তারা বলেন, পরিবেশ রক্ষায় এখন ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার বিকল্প নেই। গাছ কাটার পাশাপাশি বেশি করে গাছ লাগানো, বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে ফেলে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা এবং পরিবেশ সুরক্ষায় প্রশাসনকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করা জরুরি।

নদী ও প্রকৃতি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম বলেন, ‘আমরা যান্ত্রিক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পরিবেশকে ভুলে যাচ্ছি। বৈঠকি গানের এমন আসর মানুষের মনে খুব সহজেই সচেতনতা জাগিয়ে তুলতে পারে। প্রত্যেকে নিজের জায়গা থেকে দায়িত্বশীল হলে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।’

বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দল শ্রীপুর শাখার সভাপতি সাঈদ চৌধুরী বলেন, ‘নদী, শালবন আর লোকগান একসঙ্গে মিশলে মনে হয় এটাই আমাদের সত্যিকারের দেশ। এমন আয়োজন সামাজিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে একটি সুন্দর দেশের ছবি আঁকে, পাশাপাশি নদী ও বন রক্ষার তাগিদও বারবার মনে করিয়ে দেয়।’