
কুষ্টিয়ার মিরপুরে নবনিযুক্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) ফুলের তোড়া দিয়ে বরণ করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আবদুল গফুর। মঙ্গলবার সকালে ইউএনওর কক্ষে এ ঘটনা ঘটে। পরে সংসদ সদস্য তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে তিনটি ছবি দিয়ে একটি লেখা পোস্ট করেন।
সংসদ সদস্যের ওই পোস্টের নিচে অনেকে মন্তব্য করেছেন। রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা ক্রম বা ‘ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স’ এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
আবদুল গফুর কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনে জামায়াতে ইসলামী সংসদ সদস্য। মঙ্গলবার সকালে দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে ইউএনও আফরোজ শাহীন খসরুকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন ও উপহার তুলে দেন।
মঙ্গলবার সকাল ১০টা ১৬ মিনিটে সংসদ সদস্য ফেসবুকে তিনটি ছবি দিয়ে লেখেন, ‘মিরপুর উপজেলা নব্য নিযুক্ত নির্বাহী কর্মকর্তাকে মিরপুর উপজেলাবাসীর পক্ষ থেকে উষ্ণ অভ্যর্থনা। কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর উপজেলা-এর নব্য নিযুক্ত নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জনাব আফরোজ শাহীন খসরু-কে মিরপুর উপজেলাবাসীর পক্ষ থেকে ফুলের শুভেচ্ছা ও আন্তরিক অভিনন্দনের মাধ্যমে বরণ করে নেন মাননীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আব্দুল গফুর (কুষ্টিয়া-২: মিরপুর-ভেড়ামারা)। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত মিরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদ প্রার্থী অধ্যাপক জোমারত আলী। উপস্থিত ছিলেন মিরপুর উপজেলা শাখার আমীর জনাব রেজাউল করিম পৌর মেয়র পদ প্রার্থী আরও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান পদ প্রার্থী মওলানা ওমর ফারুক।’
ওই পোস্টে আরও লেখা হয়েছে, ‘সৌহার্দ্যপূর্ণ এ সাক্ষাতে মিরপুর উপজেলার সার্বিক উন্নয়ন, জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম এবং প্রশাসন-জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ের মাধ্যমে জনগণের কল্যাণে একযোগে কাজ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়। মাননীয় সংসদ সদস্য নব্য নিযুক্ত নির্বাহী কর্মকর্তার সফল কর্মজীবন, সুস্বাস্থ্য ও উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করেন।’
সংসদ সদস্যকে যে ফুলের তোড়া দিয়েছেন তাতে লেখা ছিল, ‘মিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার জনাব আফরোজ শাহীন খসরু মহোদয়কে শুভেচ্ছা ও স্বাগতম।’ নিচে নাম লেখা, ‘মো. আবদুল গফুর, জাতীয় সংসদ সদস্য, কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা)।’
এ বিষয়ে জানতে সংসদ সদস্য আবদুল গফুরের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
সংসদ সদস্য হয়ে একজন সরকারি কর্মকর্তাকে নিজ কার্যালয়ে গিয়ে ফুল দিয়ে বরণের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পক্ষে-বিপক্ষে নানা মন্তব্য করা হয়েছে।
একজন লিখেছেন,‘আল্লাহ এদের মাথার শুবুদ্ধী দাও, ইউএনও আর এমপির পদমর্যাদা সম্পর্কে জানতে চাই। একজন এমপি কোন প্রক্রিয়ায় ইউএনওকে সংবর্ধনা দিতে পারে? সব গিয়েছে...।’
আরেকজন মন্তব্য করেছেন, ‘এমপি ইউওনো কে বরন করলো?? নাকি ইউওনো এমপি কে বরন করলো?? প্রটোকল মাফিক কে কাকে বরন করা উচিত!!!’
এ সম্পর্কে সচেতন নাগরিক কমিটি সনাকের সদস্য মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘একজন সংসদ সদস্য যেভাবে দলবল নিয়ে ইউএনওর দপ্তরে গিয়ে ফুল দিলেন, তাতে সরকারি কর্মকর্তার ওপর রাজনৈতিক প্রভাব ও অপ্রকাশিত চাপ তৈরির বার্তা যায়। এতে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতাও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নবনিযুক্ত ইউএনও আফরোজ শাহীন খসরু প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি সম্প্রতি যোগদান করেছি। কয়েক দিন আগে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে কার্যালয়ে এসে ফুল দিয়েছিল। মঙ্গলবার স্যার (জামায়াতের এমপি) এসেছিলেন সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে। তিনি ফুল দিয়েছেন। একটি বইও উপহার দিয়েছেন, সেটি এখনো খুলে দেখা হয়নি।’
সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা–সমালোচনা বিষয়ে ইউএনও বলেন, ‘অনেকে ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সের কথা বলছেন। এ ব্যাপারে কিছু বলতে চাই না। তবে এমপি স্যারের পিএস আমাকে ফোন জানিয়েছেন যে স্যার আসবেন। এরপর স্যার এসে ফুল ও উপহার দিয়েছেন। আর যেহেতু আমরা একসঙ্গে এলাকার উন্নয়নে কাজ করব, সেই জায়গা থেকেই এমপি স্যার নিজ থেকে এসে সৌজন্য সংবর্ধনা ও উপহার দিয়েছেন। এতে ভবিষ্যতে সমন্বয় করে কাজ করা আরও সহজ হবে।’
এর আগে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে চট্টগ্রাম নগরের খুলশী থানায় এসে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী। সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন নানা স্বাদের মিষ্টিও। বিষয়টি নিয়ে তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা–সমালোচনা হয়েছিল।