আন্তর্জাতিক নারী দিবসে এ বছর ‘অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জন’ ক্যাটাগরিতে জাতীয় পর্যায়ে ‘শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী’ পুরস্কার পেয়েছেন নুরুন নাহার আক্তার। অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা নুরুন নাহার তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে সুই–সুতা কিনে কাজ শেখা শুরু করেন। অভাব পেরিয়ে এখন তাঁর জীবনে এসেছে স্বচ্ছলতা।
জীবনের নানা চড়াই–উতরাই পেরিয়ে নুরুন নাহার হয়েছেন সফল নারী উদ্যোক্তা। এখন তাঁর নিজের কারখানায় ১২০ জন নারী মজুরিভিত্তিতে কাজ করেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই নারী উদ্যোক্তা ৭৬ লাখ ৫০ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করেন। ব্যয় বাদে এখন বছরে তাঁর আয় ১৫ লাখ টাকা।
এ বছর পাঁচটি ক্যাটাগরিতে সাফল্য অর্জনকারী নারীদের হাতে সম্মাননা তুলে দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তাঁদের একজন নুরুন নাহার। তিনি জামালপুরের পাথালিয়ার মো. গোলাম নূর ও জেসমিন আক্তার দম্পতির মেয়ে। তাঁর স্বামীর বাড়ি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায়। ময়মনসিংহ নগরের বাতিরকল সড়কে শোরুম এবং মুক্তাগাছায় হস্তশিল্পের কারখানা করে সাফল্য অর্জন করেছেন তিনি।
বাতিরকল এলাকায় ‘কারুণ্য হস্তশিল্প’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে নুরুন নাহারের। ১২ মার্চ বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ভেতরে বসে সুই–সুতায় বুননের কাজ করছেন তিনি ও তাঁর এক নারী কর্মী। তাঁর এই প্রতিষ্ঠান নকশিকাঁথা, শাড়ি, থ্রি–পিস, ওড়নাসহ হাতের তৈরি নানা পণ্য দিয়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। দোকানের একপাশে শোকেস ও টেবিলে রয়েছে নানা অর্জনের ক্রেস্ট।
কীভাবে এ সাফল্যের শুরু, এ কথা বলতে গিয়ে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন নুরুন নাহার। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ছিলেন। দুই ভাইবোনের মধ্যে আমি বড় ছিলাম। সংসার চালাতে বাবার খুব কষ্ট হতো দেখে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে সুই–সুতা কিনে কাজ শেখা শুরু করি। সে সময় লুকিয়ে কাজ করে সংসারে সহযোগিতা করতে থাকি। মজুরিভিত্তিতে হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠানে কাজ করেই ২০০৫ সালে এসএসসি পাস করি। অভাবের কারণে উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর আগেই ১৭ বছর বয়সে ২০০৭ সালে আমাকে বিয়ে দেওয়া হয় মুক্তাগাছার ঈশ্বরগ্রামের হাফিজুর রহমানের সঙ্গে।’
হাফিজুর ঢাকার একটি টেক্সটাইল কারখানায় ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কিন্তু নুরুন নাহারকে থাকতে হতো শ্বশুরবাড়িতে। তিনি বলেন, ‘আমার শ্বশুরবাড়ির লোকজনের মতে, মেয়েদের বেশি পড়াশোনা করা উচিত নয়। আমার পড়াশোনা বন্ধ করে সংসারের সব কাজের দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়। আমাকে নিয়ে চরিত্রহননমূলক কথা, মানসিক নির্যাতন, খাবারের অবহেলা—সব মিলিয়ে অসহনীয় পরিবেশ তৈরি করেন আমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন, শুধু পড়াশোনায় আগ্রহী ছিলাম বলে। এ নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্যে যৌতুকের দাবি, মানসিক নির্যাতন ও অসম্মানজনক আচরণে বাধ্য হয়ে বিয়ের এক বছরের মাথায় ২০০৮ সালে বাবার বাড়িতে ফিরে যাই। বান্ধবীদের পরামর্শে আমি আনন্দমোহন কলেজে বাংলা বিভাগে অনার্সে ভর্তির আবেদন করি এবং ভর্তি হই। পরিবারের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে নিজের গয়না বিক্রি করে ও ঋণ নিয়ে পড়াশোনা শুরু করি। এ ছাড়া ছাত্রীদের মেসে থেকে টিউশনি করে নিজের খরচ চালাতাম, বাবাকেও সাহায্য করতাম। দুই বছরের মধ্যে শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে আমাকে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়, বিশেষ করে শাশুড়ির অসুস্থতার পর। বাধ্য হয়ে আমি শ্বশুরবাড়িতে ফিরে যাই। ফেরার পরপরই তাঁরা আমাকে সন্তান নেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন। আমাকে বিভিন্ন ধরনের অপবাদও দেওয়া হয়। বর্তমানে আমার মেয়ে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে গ্রেড সিক্স ও ছেলে গ্রেড থ্রিতে পড়ছে।’
নুরুন নাহার বলেন, ‘২০১১ সালে স্বামীর অসুস্থতা ও চাকরি হারানোর ফলে সংসারে সংকট দেখা দেয়। মা–বাবার দেওয়া গয়না বিক্রি করে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে কিছু হস্তশিল্পের পোশাক কিনে বাড়ি বাড়ি বিক্রি শুরু করি। কিস্তিতে সেলাই মেশিন কিনে অর্ডার অনুযায়ী পোশাক তৈরি ও বিক্রি শুরু করি। ধীরে ধীরে আমার ডিজাইনের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে, ক্রেতাও বাড়তে থাকে। শ্বশুরবাড়ি আমার এই উদ্যোগকে অসম্মানজনক মনে করে বিরূপ মনোভাব দেখাতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত আমাদের পরিবারকে বাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য করে। স্বামী-সন্তান নিয়ে মুক্তাগাছা শহরে ভাড়া বাসায় আসি। দোকান দেওয়ার জন্য এক প্রতিবেশী নারীর পরামর্শে ২০১৬ সালে যৌথভাবে ব্যবসা শুরু করি। ব্যাংক থেকে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করি। ব্যবসা ভালো চললেও পার্টনার গোপনে দোকানের চুক্তিপত্র নিজের নামে করেন এবং সব পুঁজি ও পণ্য আত্মসাৎ করেন। আমি সর্বসান্ত হয়ে পড়ি। মানসিক চাপ ও কষ্টে অসুস্থ হয়ে পড়লেও হাল ছাড়িনি।’
নুরুন নাহার আরও বলেন, ‘আবারও ব্যাংক ঋণ নিয়ে ২০১৮ সালে “কারুণ্য হস্তশিল্প” নামে মুক্তাগাছা শহরে নিজস্ব দোকান শুরু করি। স্বামীকেও একটি ইলেকট্রনিকসের দোকান করে দিই। নিজে পোশাক তৈরি করার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গ্রামীণ নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করি এবং তাঁদের অনেককেই আমার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করি। পরিশ্রম করে সব ঋণ শোধ করে মুক্তাগাছায় পাঁচ শতাংশ জমি ক্রয় করি এবং দোকান ও বাসা একসঙ্গে নির্মাণ করি।’
নুরুন নাহার শুধু এখন নিজে স্বাবলম্বী নন, নারীদের প্রশিক্ষিতও করেন। তিনি বলেন, ‘আমি মূলত অসহায়, দরিদ্র, স্বামীপরিত্যক্ত ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের স্বাবলম্বী করার ব্রত নিয়ে কাজ শুরু করি এবং হস্ত ও কুটিরশিল্পের মাধ্যমে নারীরা যেন আত্মনির্ভরশীল হতে পারে, সে লক্ষ্যে নিজ উদ্যোগে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করি। এ পর্যন্ত ১ হাজার ২ শতাধিক নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। এ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁরা নিজস্ব পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছেন এবং নিজেদের পরিবার ও দাম্পত্য জীবন নিয়ে মর্যাদাপূর্ণ দিন কাটাচ্ছেন। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারীদের মধ্যে অনেকেই নিজেই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। অনেককে সাহায্য করেছি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের জন্য, অনেকে যুক্ত হয়েছেন আমার কারুণ্য হস্তশিল্পতেও। বর্তমানে মুক্তাগাছা ও ময়মনসিংহে আমার দুটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আমি আমার পরিবারকে স্বাবলম্বী করেছি এবং বহু নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছি। আমার তৈরি পণ্য বিদেশে রপ্তানির স্বপ্ন দেখছি।’
কারুণ্য হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠানে প্রায় তিন বছর ধরে কাজ করেন আম্বিয়া খাতুন। তিনি সদর উপজেলার চুরখাই এলাকার বাসিন্দা। তিনি বলেন, ‘এখানে কাজ করে পরিবারকে সাহায্য করছি।’
মহিলাবিষয়ক অধিপ্তরের ময়মনসিংহ জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক নাজনীন সুলতানা বলেন, ‘ঋণ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নুরুন নাহারসহ উদ্যোক্তাদের আমরা সহযোগিতা করে থাকি। তাঁদের মানসিক সাপোর্টও দেওয়া হয়। নুরুন নাহার এবার জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কৃত হয়েছে। তিনি তাঁর তৈরি পণ্য বিদেশে রপ্তানি করতে চান। তাঁকে আমাদের পক্ষ থেকে যা সহযোগিতা করা দরকার, তা করা হবে।’