নওগাঁর নিয়ামতপুরের বাহাদুরপুর গ্রামে একই পরিবারের চারজন খুন হয়েছেন। ঘটনাস্থলে ভিড় জমিয়েছেন প্রতিবেশী ও স্বজনেরা। আজ মঙ্গলবার দুপুরে
নওগাঁর নিয়ামতপুরের বাহাদুরপুর গ্রামে একই পরিবারের চারজন খুন হয়েছেন। ঘটনাস্থলে ভিড় জমিয়েছেন প্রতিবেশী ও স্বজনেরা। আজ মঙ্গলবার দুপুরে

নওগাঁয় এক পরিবারে চার খুন : ডাকাতি ও পূর্বশত্রুতা সামনে রেখে তদন্ত করছে পুলিশ

নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলায় এক দম্পতি ও তাঁর দুই ছেলে–মেয়েকে হত্যার ঘটনায় সম্ভাব্য দুটি কারণ জানা যাচ্ছে। ডাকাতি অথবা পূর্বশত্রুতার জেরে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে বলে নিহত ব্যক্তিদের স্বজন, স্থানীয় বাসিন্দা ও থানা-পুলিশ ধারণা করছে। এ দুটি বিষয় সামনে রেখে তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

আজ মঙ্গলবার সকালে উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ বাড়ির আঙিনায় ঢেকে রাখা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের শিকার গৃহবধূ পপি সুলতানার (৩০) মা সাবিনা বেগম মেয়ে, জামাতা ও দুই নাতি–নাতনির মরদেহের পাশা আহাজারি করছিলেন।

আহাজারি করতে করতে সাবিনা বেগম বলেন,  ‘১৩-১৪ বছর আগে মেয়ের বিয়ে হয়। বিয়ে হওয়ার পর থেকে ননদরা আমার মেয়ের সঙ্গে অশান্তি করে। এক বাচ্চা হওয়ার পরে মেয়ে যখন বেড়াতে যায়, তখন মেয়েকে তালাক পাঠায়। বোনেরা মিলে গন্ডগোল করে; কিন্তু আমার জামাইয়ের একই কথা, “আমি নেব, সংসার করব।” আমার জামাইয়ের ওপর ভরসা করে মেয়েকে আবারও পাঠাই। আমার মেয়েকে তারা বহুদিন থেকে নির্যাতন করতেছে। জমির ভাগাভাগি নিয়ে ওরা পাঁচ বোন মিলেই আমার মেয়ে, জামাই, নাতি-নাতনিকে মেরে ফেলছে।’

গতকাল সোমবার মধ্যরাতে উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামে পপি সুলতানাসহ তাঁর পরিবারের চারজনকে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। হত্যাকাণ্ডের শিকার অন্য তিনজন হলেন পপি সুলতানার স্বামী হাবিবুর রহমান (৩৫), তাঁর ছেলে পারভেজ রহমান (৯) ও মেয়ে সাদিয়া খাতুন (৩)। আজ সকালে তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

সাবিনা বেগম আরও বলেন, ‘কয়েক দিন আগে আমার মেয়ের ননদ শিরিনা, তার স্বামী ও ছেলের বউ মিলে আমার মেয়েকে মারধর করে। তখন তারা থানায় যায়। পুলিশ ওদের অভিযোগ নিলেও আমার জামাইয়ের কোনো অভিযোগ নেয়নি। পরে গ্রামের মানুষ আপস–মীমাংসা করে দেয়। জমি যখন আমার জামাইকে দেয়, তখন তার পাঁচ বোনকেও আড়াই বিঘা করে জমি লিখে দেয় আমার মেয়ের শ্বশুর। আর আমার জামাইকে ভিটাবাড়ি মিলে ১০ বিঘা জমি দেয়। এইটা নিয়েই তাদের হিংসা শুরু হয়। আমি এদের সবার ফাঁসি চাই।’

নিহত হাবিবুরের বাবা নমির উদ্দিন (৭০) বলেন, ‘আমার ছেলে, বউমা আর দুই নাতিনাতনি রাতে একই ঘরে ঘুমাইছিল। আর আমি অন্য ঘুরে ঘুমাইছিলাম। কখন তাদের মাইরে গেছে, আমি কিছুই জানতে পারিনি। সকালে বাড়ির বাইরের দরজা খোলা দেখে এক প্রতিবেশী বাড়িত ঢুকে প্রথমে আঙিনায় বউমার লাশ দেখে চিৎকার করে ওঠে। তার চিৎকার শুনে আমার ঘুম ভাঙে। উঠে দেখি, আঙিনায় বউমার রক্তাক্ত লাশ। আর ঘরের ভেতর ছেলে ও নাতি–নাতনির লাশ। আমার ছেলে ও তার পরিবারকে শেষ করে দিছে।’

নিহত হাবিবুরের স্বজন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাবিবুর পেশায় গরু ব্যবসায়ী ছিলেন। গতকাল মান্দার চৌবাড়িয়া হাটে গরু বিক্রি করতে গিয়েছিলেন হাবিবুর। তাঁর কাছে থাকা গরু বিক্রির টাকা লুট করার জন্য এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে বলে অনেকে ধারণা করছেন।

নিয়ামতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুবুর রহমান বলেন, নিহত ব্যক্তিদের প্রত্যেকের মাথায় ভারী কিছু দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, মাথায় আঘাত করার পর হাবিবুর ও দুই সন্তানকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। হাবিবুরের স্ত্রী দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। বাড়ির আঙিনায় মাথায় আঘাত ও গলা কেটে তাঁকে হত্যা করা হয়। নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নওগাঁ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

মঙ্গলবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ইতিমধ্যে বেশ কিছু তথ্য পুলিশের কাছে এসেছে। প্রাথমিকভাবে এ হত্যাকাণ্ড কোনো ডাকাতি বা দস্যুতা ওই রকম ঘটনা মনে হচ্ছে না। ঘটনাটি পরিবার সংক্রান্ত বা জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে হতে পারে। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট একযোগে কাজ করছে। দ্রুতই ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করা হবে।

এদিকে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তারা হলেন, নিহত হাবিবুর রহমানের বাবা নমির উদ্দিন (৭০), বোন ডালিমা ও হালিমা এবং ভাগনে সবুজ রানা (২৫)।