যশোরের অভয়নগর তরুণ পাঠাগার। গত শুক্রবার অভয়নগর উপজেলার অভয়নগর গ্রামে
যশোরের অভয়নগর তরুণ পাঠাগার। গত শুক্রবার অভয়নগর উপজেলার অভয়নগর গ্রামে

আজ জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস

পাড়াগাঁয়ে এক টুকরা আলো

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রাজাকাররা পাঠাগারটি তছনছ করে ফেলে। সব দুর্লভ, প্রাচীন, মূল্যবান গ্রন্থ হারিয়ে যায়।

এক কক্ষের একতলা পাকা দালান। জরাজীর্ণ। কিন্তু ভেতরটা যেন আলোর বাতিঘর। পড়ুয়াদের কাছে ভালো লাগার প্রতিষ্ঠানটি হচ্ছে অভয়নগর তরুণ পাঠাগার। একাধিকবার এই বাতিঘর দুর্বিপাকে পড়েছে। নানা সংকটে আলো নিবু নিবু করেছে। কিন্তু কখনোই নিভে যায়নি। বরং নিভৃত এক পল্লিতে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক টুকরা আলোর উৎস হয়ে। ৮০ বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য ধারণ করে আজও স্বমহিমায় জানান দিচ্ছে নিজের অস্তিত্ব।

যশোরের অভয়নগর উপজেলার অভয়নগর গ্রামে এই পাঠাগারের অবস্থান। পাঠাগারটি গ্রামের প্রায় মধ্যখানে, চারপাশ ঘেরা অসংখ্য গাছগাছালিতে। ছায়া সুনিবিড় পরিবেশ। পাখির কলকাকলিতে মুখর। এর উত্তরে অভয়নগর পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং দক্ষিণে অভয়নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

পাঠাগার কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, বাংলা ১৩৫০ সনে (১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দ) সাহিত্যানুরাগী স্থানীয় কৃষক সুধাংশু দে, বিমল নাগ, কালীপদ দাশ, মিহির দাশ, যতীন্দ্রনাথ পাল, অসীম কুমার দত্ত প্রমুখ মিলে পাঠাগারটি গড়ে তোলেন। বছরটি ছিল পঞ্চাশের মন্বন্তরের বছর। দুর্ভিক্ষের মধ্যেও পাঠাগারটিকে আপন করে নেন স্থানীয় মানুষজন। এই পাঠাগারের উদ্যোগে ১৯৫৭ সালে অভয়নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ১৯৭১ সালে অভয়নগর পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে মূল্যবান গ্রন্থের সমাবেশ ঘটতে থাকে পাঠাগারটিতে। স্বাধীনতার আগপর্যন্ত পাঠাগার থেকে ভোরের আলো নামে নিয়মিত একটি দেয়ালপত্রিকা বের হতো। পাঠাগারের সামনে ফাঁকা জায়গায় প্রতিবছর দুটি যাত্রানুষ্ঠান, রবীন্দ্র-নজরুলজয়ন্তী ও নাটক অনুষ্ঠিত হতো। অনুষ্ঠিত হতো বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। পালন করা হতো জাতীয় দিবসগুলো। এখনো জাতীয় দিবসগুলোতে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হলেও সেই জাঁকজমক আর নেই।

সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠার আড়াই দশকের মাথাতেই বিপর্যয়ের মুখে পড়ে পাঠাগারটি। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রাজাকাররা পাঠাগারটি তছনছ করে ফেলে। সব দুর্লভ, প্রাচীন, মূল্যবান গ্রন্থ হারিয়ে যায়। ভাঙচুর করা হয় পাঠাগারের হারমোনিয়াম, তবলা, গিটার এবং দেয়ালে ঝোলানো বিভিন্ন দুর্লভ ছবি। বই হারিয়ে পাঠাগারটি নিঃস্ব হয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধ শেষে আবার পাঠাগারটি সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে বইয়ে বইয়ে। তবে ২০০৩ সালে স্থানীয় একটি মহল পাঠাগারটির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। সাইনবোর্ড ভেঙে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে ভৈরব নদে ফেলে দেওয়া হয়। এত কিছুর পরও পাঠাগারটি থেমে যায়নি।

অভয়নগর তরুণ পাঠাগারে বই পড়ছেন পাঠক। গত শুক্রবার

একতলাবিশিষ্ট পাঠাগারটি প্রায় দুই শতক জমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। পাশেই পাঠাগারের জমি আছে আরও প্রায় ৪১ শতক। এর মধ্যে ১৫ শতক জমি বছরে তিন হাজার টাকা চুক্তিতে বন্ধক দেওয়া হয়। সে আয়ে চলছে পাঠাগারটি। তবে এ সামান্য আয়ে পাঠাগারটি টিকিয়ে রাখা দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরপরও পাঠাগারটি সপ্তাহে সাত দিনই খোলা থাকছে। পাঠাগার পরিচালনার জন্য একটি পরিচালনা কমিটি আছে।

পাঠাগারের যখন রমরমা অবস্থা, তখন প্রায় তিন হাজার বই ছিল। এখন বই কমতে কমতে বই আছে শ দুয়েকের কিছু বেশি। অর্থসংকটে নিয়মিত পত্রিকা রাখা হয় না। পাঠাগারের সদস্য ১৩০ জন। পাঠাগারে বসে বই পড়া ছাড়াও সদস্যরা বাড়িতে বই নিয়ে যেতে পারেন। অবসরপ্রাপ্ত পাটকলশ্রমিক হামিদুল ইসলাম নিয়মিত এখানে আসেন। তিনি বলেন, ‘এখন নিয়মিত সংবাদপত্র থাকে না। বইও কম। তবে পড়ার জন্য পরিবেশটা খুব ভালো।’ পানচাষি ভজহরি বর্মণ বলেন, ‘সময় পেলে এখানে পড়তে আসি। খুব ভালো লাগে।’

পাঠাগার পরিচালনা পর্ষদের সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন মিলন কুমার পাল। তিনি বলেন, ‘পাঠাগারে নানা সংকট রয়েছে। পাঠাগার ভবনটি জরাজীর্ণ। এখন আর্থিক সংকটে নতুন বই সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। দরকার নিয়মিত অন্তত দুটি সংবাদপত্র। পাঠাগার পরিচালনার জন্য স্থায়ী একটি আয়ের উৎসও দরকার। এত সংকটের মধ্যেও আমরা পাঠাগারটি চালু রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছি।’