কক্সবাজার শহরের সুগন্ধা সৈকতে বালিয়াড়ির ওপর নির্মণাধীন চার লেনের সড়ক প্রকল্প। সম্প্রতি তোলা
কক্সবাজার শহরের সুগন্ধা সৈকতে বালিয়াড়ির ওপর নির্মণাধীন চার লেনের সড়ক প্রকল্প। সম্প্রতি তোলা

সাগরের বালিয়াড়িতে সড়ক নির্মাণ

পরিবেশ রক্ষায় আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা, কক্সবাজার জেলা প্রশাসকসহ চার কর্মকর্তাকে নোটিশ

কক্সবাজার শহরের প্রতিবেশ সংকটাপন্ন সুগন্ধা সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট করে ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প (শহর রক্ষা বাঁধ) বাস্তবায়ন করছে কক্সবাজার পৌরসভা কর্তৃপক্ষ। বাস্তবায়নাধীন ওই প্রকল্পে অর্থায়ন করছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। প্রকাশ্যে সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে সড়ক নির্মাণকে আদালত অবমাননার শামিল উল্লেখ করে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক, জাইকার বাংলাদেশ প্রতিনিধি, পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাসহ চারজনকে আদালত অবমাননার নোটিশ পাঠিয়েছেন ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’-(এইচআর পিবি) চেয়ারম্যান ও হাইকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।

যাঁদের নোটিশ পাঠানো হয়েছে, তাঁরা হলেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান, কক্সবাজার পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আদনান চৌধুরী, সড়ক নির্মাণকাজের প্রকল্প পরিচালক এ এস এম রাশেদুর রহমান ও জাইকার বাংলাদেশ প্রতিনিধি তাকাহাসকি জানকো। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নির্মাণকাজ বন্ধ করা না হলে নোটিশ পাঠানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা করা হবে মর্মে নোটিশে উল্লেখ করা হয়।

চার কর্মকর্তাকে আজ বৃহস্পতিবার ই-মেইল ও ডাকযোগে আদালত অবমাননার নোটিশ পাঠানোর সত্যতা প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেন হাইকোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। তিনি বলেন, বিশ্বের দীর্ঘতম কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত দেশের অমূল্য সম্পদ। প্রতিবেশ সংকটাপন্ন (ইসিএ) এই সৈকতের বালিয়াড়ি দখল বা ভরাট করে যেকোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এখন সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সুগন্ধা সৈকত থেকে কলাতলীর দিকে চার লেনের স্থায়ী সড়ক নির্মিত হচ্ছে। তাতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের শঙ্কা রয়েছে। কাজ বন্ধ না হলে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে মামলা করা হবে।

উল্লেখ্য, কয়েক দিন আগে সুগন্ধা সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট করে দক্ষিণ দিকে কলাতলী পর্যন্ত ১ দশমিক ২ কিলোমিটারের ‘শহর রক্ষা বাঁধের’ কাজ শুরু হয়। সড়কের প্রস্থ হবে ২৮ মিটার। কাজের বিপরীতে জাইকা বরাদ্দ দিয়েছে ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। প্রথম ধাপের এই কাজ শেষ হলে দ্বিতীয় ধাপে সায়মান বিচ রিসোর্ট থেকে দক্ষিণ দিকে বেলি হ্যাচারি পর্যন্ত আরও ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের কথা রয়েছে। সড়ক নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বেসরকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স (এনডিই)।

এ প্রসঙ্গে পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রোমেল বড়ুয়া প্রথম আলোকে বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়েই সুগন্ধা সৈকতে শহর রক্ষা বাঁধের কাজ হচ্ছে। প্রকল্পটি আগেই একনেকে পাস হয়েছে। এর আগে জরিপ-নকশা, গবেষণা সবই করা হয়েছে। প্রকল্পের জন্য পরিবেশেরও তেমন ক্ষতি হবে না।

কক্সবাজার শহরের সুগন্ধা সৈকতে বালিয়াড়ির ওপর নির্মণাধীন চার লেনের সড়ক প্রকল্প বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি। আজ দুপুরে

এদিকে সৈকতের বালিয়াড়িতে সড়ক নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করায় ফুঁসে উঠেছে পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠন। তাদের দাবি—বালিয়াড়ি ভরাট করে নির্মিত এই সড়ক টিকবে না। মেরিন ড্রাইভের মতো এই সড়কও সমুদ্রের জোয়ারের ধাক্কায় একসময় বিলীন হবে। তা ছাড়া সড়ক প্রকল্প হলে লাল কাঁকড়া, উপকূল রক্ষার সাগরলতা ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হবে।

সড়কের নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার দাবিতে গত রোববার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বরাবরে স্মারকলিপি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)। এরপর পাশাপাশি প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) সড়ক নির্মাণের কৈফিয়ত তলব করে প্রকল্পের পরিচালক ও পৌরসভা কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। অন্যদিকে পরিবেশ আইন লঙ্ঘন ও উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইসিএ এলাকায় সড়ক নির্মাণ কেন বন্ধ হবে না, তার কারণ দর্শিয়ে দুই সচিবসহ আটজন সরকারি কর্মকর্তাকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি-বেলা। নোটিশ প্রাপ্তির পাঁচ দিনের মধ্যে গৃহীত পদক্ষেপ বেলাকে জানাতে বলা হয়েছে। অন্যথায় বেলা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে মর্মে নোটিশে উল্লেখ করা হয়।

নির্মাণকাজ স্থগিত চেয়ে মানববন্ধন-প্রতিবাদ সমাবেশ

সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট করে নির্মিত পৌরসভার সড়ক প্রকল্প বন্ধের দাবিতে আজ দুপুরে কক্সবাজার পৌরসভার ভবন চত্বরে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক কয়েকটি সংগঠন।

‘ইকো-ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট কক্সবাজারের’ ব্যানারে আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য দেন ক্লাইমেট জাস্টিস বাংলাদেশ এর মুখপাত্র মো. জাবেদ নূর শান্ত, ভয়েস অব কক্সবাজার ভলান্টিয়ারের সভাপতি মো. কামরুল হাসান, ইয়ুথ অ্যালায়েন্স ফর সাসটেইনেবল ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট নির্বাহী প্রধান কায়সার হামিদ, জলবায়ু যোদ্ধা ও ম্যাজিক ইনিশিয়েটিভ সভাপতি জিমরান মো. সায়েক, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কক্সবাজারের সাবেক আহ্বায়ক এস এস সাগর প্রমুখ।

‘ইকো-ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট কক্সবাজার’–এর মুখপাত্র জাবেদ নূর শান্ত বলেন, ‘কক্সবাজারের উন্নয়ন আমরাও চাই। কিন্তু প্রতিবেশ সংকটাপন্ন সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট কিংবা দখল করে নয়। ২০ মিনিট বৃষ্টি হলে পুরো শহর ডুবে যায়, জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে, সড়কের নালা ড্রেনগুলো ঠিকমতো পরিষ্কার করা হয় না। জলাবদ্ধতার নিরসনে কোনো প্রকল্প নেই।’

সমাবেশ শেষে ইকো-ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টের পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে সুগন্ধা সড়ক নির্মাণকাজ স্থগিত এবং নকশা পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানিয়ে সড়ক প্রকল্প পরিচালক বরাবরে স্মারকলিপি পাঠানো হয়।