
শৈলজারঞ্জন মজুমদারের জন্মভিটায় নির্মিত সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি গত দুই বছর ধরে কার্যত অচল।
‘বেড়ার ওপারে মৌসুমি ফুলে রঙের স্বপ্ন বোনা,
চেয়ে দেখে দেখে জানালার নাম রেখেছি—“নেত্রকোণা”।’
শ্যামলী কাব্যগ্রন্থে ‘উৎসর্গ’ কবিতায় নেত্রকোনার কথা এভাবেই লিখেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অথচ তিনি কোনো দিন নেত্রকোনায় আসেননি। এই জনপদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় তৈরি হয়েছিল রবীন্দ্রসংগীতাচার্য শৈলজারঞ্জন মজুমদারের মাধ্যমে। সেই শৈলজারঞ্জনের জন্মভিটায় তিন বছর আগে ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বিশাল সাংস্কৃতিক কেন্দ্র উদ্বোধন করা হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কেন্দ্রটিতে লুটপাট চালানো হয়।
শৈলজারঞ্জন মজুমদার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ পৌর কার্যালয় থেকে দুই কিলোমিটার দূরে বাহাম গ্রামে। সেখানে সোয়া দুই একর জমির ওপর কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। গত দুই বছর এই কেন্দ্রে কোনো সাংস্কৃতিক আয়োজন হয়নি।
নেত্রকোনা জেলা উদীচীর সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান শুধু ভবন, জাদুঘর কিংবা মিলনায়তন দিয়ে জীবন্ত হয় না। নিয়মিত অনুষ্ঠান, প্রশিক্ষণ, গবেষণা, শিল্পীদের অংশগ্রহণ এবং দর্শনার্থীদের আনাগোনার মধ্য দিয়েই একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রাণ পায়। শৈলজারঞ্জন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে এখন সেই প্রাণেরই অভাব।’
সরেজমিনে যা দেখা গেল
২৫ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটক বন্ধ। পরে মোহনগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা খাতুনের (ইউএনও) সঙ্গে যোগাযোগ করেন এই প্রতিবেদক। এর কিছুক্ষণ পর মোহাম্মদ সামিউজ্জামান নামের এক ব্যক্তি এসে ফটকের তালা খুলে দেন। কথা বলে জানা যায়, তিনি কেন্দ্রটির ‘টেকনিশিয়ান’। বর্তমানে কেন্দ্রটির সার্বিক দায়িত্ব তাঁকেই সামলাতে হচ্ছে।
কেন্দ্রে প্রবেশ করে দেখা যায়, দীর্ঘ সময় পরিচর্যা না করায় কেন্দ্রের ভেতরে হাঁটার পথ ও খোলা জায়গা ঘাস-লতাপাতায় ঢেকে গেছে। ভবনের ভেতরে গ্রন্থাগার ও মহড়া কক্ষের ছাদের কিছু অংশ ভেঙে গেছে। মিলনায়তনের অনেক সরঞ্জাম নেই। লিফটও অকেজো। বিভিন্ন কক্ষে ৫টি এসি অকার্যকর, অন্তত ৫৩টি বাতি নষ্ট।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে এই কেন্দ্রের বৈদ্যুতিক পাখা, চেয়ার, টেবিল, ঝাড়বাতি, বিভিন্ন ধরনের বাতি, সিসিটিভি ক্যামেরা, সাউন্ড বক্স, আইপিএস, কম্পিউটার, মনিটর, বাদ্যযন্ত্র, বজ্রনিরোধক যন্ত্র, অডিটোরিয়ামের কন্ট্রোল বক্সসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, আসবাব ও সরঞ্জাম লুট হয়। পরে স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্যোগে সেগুলোর কিছু ফেরত আনা হয়েছে।
ভবন আছে, নেই সাংস্কৃতিক কার্যক্রম
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন গণপূর্ত বিভাগ কেন্দ্রটি নির্মাণ করে। ২০১৮ সালের ২ নভেম্বর প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা। ভূমি অধিগ্রহণে ব্যয় ধরা হয় পাঁচ কোটি টাকা। এর বাইরে সংযোগ সড়ক নির্মাণেও প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। সব মিলিয়ে অঙ্ক দাঁড়ায় ৫০ কোটি।
নির্মাণকাজ শেষে ২০২৩ সালের ১১ মার্চ কেন্দ্রটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। মূল পরিকল্পনায় ছিল, এখানে রবীন্দ্রসংগীতের প্রশিক্ষণ ও গবেষণা হবে। পাশাপাশি নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও হাওরাঞ্চলের লোকসংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা এবং উৎসব আয়োজন করা হবে। উদ্বোধনের পর সেখানে এক বছরে কয়েকটি অনুষ্ঠান হয়েছে।
২৫ আগস্ট নেত্রকোনার মদন উপজেলা থেকে এই কেন্দ্র দেখতে আসা সংস্কৃতিকর্মী মো. সানোয়ারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, এত টাকা খরচ করে এত সুন্দর স্থাপনা হলো; কিন্তু এখানে কোনো অনুষ্ঠান হয় না। এটা খুবই দুঃখের বিষয়। এ ব্যাপারে পরিচালনা কমিটির যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
কমিটি আছে, সভা নেই
কার্যক্রম শুরুর পর সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি পরিচালনার জন্য ২১ সদস্যের একটি কমিটি আছে। পদাধিকারবলে জেলা প্রশাসক কমিটির সভাপতি। মোহনগঞ্জের ইউএনও এই কেন্দ্রের সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
কমিটির একজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, ‘কমিটিতে আমাকে রাখা হয়েছে; কিন্তু গত তিন বছরে একটি সভাও আহ্বান করা হয়নি। কেন্দ্রটির নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যে কমিটি, সেটির কার্যক্রমই যদি না থাকে, তাহলে প্রতিষ্ঠানটি সচল হবে কীভাবে?’ কেন্দ্রটির জনবলকাঠামোতেও বড় ঘাটতি রয়েছে। ইউএনও জানান, কেন্দ্রটিতে ৩৪টি পদের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র দুজন—টেকনিশিয়ান মোহাম্মদ সামিউজ্জামান ইমন ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী জয় হরিচরণ। এ দুই কর্মীর বেতন-ভাতাসহ বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য খাতে মাসে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা ব্যয় হয়।
সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটির নিজস্ব তহবিলে প্রায় এক কোটি টাকা আছে বলে জানিয়েছেন ইউএনও। সরকারি অনুদানের পাশাপাশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চাইলে ওই তহবিলে অর্থ দিতে পারে। কেন্দ্রে প্রবেশ ফি ২০ টাকা।
সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি নিয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে জানিয়ে নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এই কেন্দ্র কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা ভাবা হচ্ছে।
১৯০০ সালের ১৯ জুলাই মোহনগঞ্জের বাহাম গ্রামে জন্ম নেওয়া শৈলজারঞ্জন মজুমদার ছিলেন রবীন্দ্রসংগীতের বিশিষ্ট সাধক, শিক্ষক ও স্বরলিপিকার। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ‘গীতাম্বুধি’ উপাধি দিয়েছিলেন। বিশ্বভারতী তাঁকে ‘দেশিকোত্তম’ উপাধি দেয়। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার উপাধি দেয়।
শৈলজারঞ্জন মজুমদারের জীবনীগ্রন্থের প্রণেতা সঞ্জয় সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ করায় আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম। আমাদের ধারণা ছিল, এটি সংস্কৃতিচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠবে; কিন্তু কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতায় এটি এক অচলায়তনে পরিণত হয়েছে, যা খুবই দুঃখজনক। আমরা চাই, সরকার রাষ্ট্রের এই সম্পদ যথাযথভাবে কাজে লাগাক। প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ দিয়ে এটিকে সচল করুক।’