নওগাঁ শহরের আব্দুল জলিল শিশু পার্কসংলগ্ন ‘বিজয়স্তম্ভ’। সম্প্রতি তোলা
নওগাঁ শহরের আব্দুল জলিল শিশু পার্কসংলগ্ন ‘বিজয়স্তম্ভ’। সম্প্রতি তোলা

বিজয়ের পরদিনও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, নওগাঁ মুক্ত হয় ১৮ ডিসেম্বর

মুক্তিযোদ্ধারা ভেবেছিলেন, বিনা বাধায় নওগাঁয় প্রবেশ করবেন। কিন্তু ১৬ ডিসেম্বরের আনুষ্ঠানিক বিজয়ের পরও পাকিস্তানি বাহিনীর শক্ত প্রতিরোধের মুখে পড়লেন তাঁরা। বিজয়ের পরদিনও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয় নওগাঁয়। মুক্তিসেনাদের সঙ্গে এসে যোগ দেয় মিত্রবাহিনী। অবশেষে ১৮ ডিসেম্বর যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে প্রায় দুই হাজার পাকিস্তানি সেনা।

নওগাঁর বিভিন্ন জায়গায় যুদ্ধ করেছেন গোলাম সামদানি। তিনি বলেন, ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকায় আত্মসমর্পণের পর মুক্তিবাহিনীর স্থানীয় কমান্ডার জালাল হোসেন চৌধুরী নওগাঁ সদরের গড়েরবাড়িতে গ্রুপ কমান্ডারদের নিয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পরের দিন সকাল ৭টায় গড়েরবাড়ি থেকে প্রায় ৩৫০ মুক্তিযোদ্ধা নওগাঁ শহরের দিকে অগ্রসর হন। দলটি শহরের কাছাকাছি জগৎসিংহপুর ও খলিশাকুড়ি আসতেই পাকিস্তানি সেনারা মর্টার শেল ছোড়া শুরু করে। শহরের ভেতরে যতই ঢুকছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা, ততই বাড়ছিল শেল নিক্ষেপ। একপর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধারা পাল্টা গুলি ছোড়েন। শুরু হয় সম্মুখযুদ্ধ। মাঝে ছোট যমুনা নদী। পরের দিন মিত্রবাহিনী যোগ দিলে পাকিস্তানিদের পতন ত্বরান্বিত হয়।

পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের সেই দৃশ্য আজও বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলামের চোখে ভাসে। তিনি বলেন, ‘আমরা যখন লিটন ব্রিজ দিয়ে শহরের ভেতরে প্রবেশ করছিলাম, তখন দেখি, পাকিস্তানি সেনারা অস্ত্র মাটিতে রেখে রাস্তার দুই ধারে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সকাল ১০টার দিকে শহরের কেডি স্কুলের মাঠে পাকিস্তানি মেজর সাঈদ তাঁর অধীন ১ হাজার ৯০০ সেনা নিয়ে মিত্রবাহিনীর মেজর পি বি রাওয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এই আনুষ্ঠানিকতায় ৭ নম্বর সেক্টরের ক্যাপ্টেন গিয়াস চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।’

নওগাঁ মুক্ত দিবস উপলক্ষে স্থানীয় সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন একুশে পরিষদ নওগাঁর শোভাযাত্রা। আজ সকালে শহরের মুক্তির মোড়ে

একাত্তরের ৯ মাস নওগাঁ সদরের বিল অঞ্চল, রানীনগর ও আত্রাইয়ে যুদ্ধ করেছেন আফজাল হোসেন। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নওগাঁ জেলা ইউনিটের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার তিনি। সেদিনের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ১৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানিদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে ছয়জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। হতাহত হয় অনেক পাকিস্তানি সেনা। পরদিন বগুড়া থেকে অগ্রসরমাণ মিত্রবাহিনীর মেজর চন্দ্র শেখর ও বালুরঘাট থেকে নওগাঁ অভিমুখে অগ্রসরমাণ মেজর পি বি রাওয়ের নেতৃত্বে ভারতীয় মিত্রবাহিনী ও মুক্তিসেনা নওগাঁয় প্রবেশ করে।

আত্মসমর্পণের পর অনেক পাকিস্তানি সেনার সঙ্গে কথা হয়েছে আফজাল হোসেনের। তিনি জানান, পাকিস্তানিরা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে চায়নি। নিজেদের ৯ মাসের বর্বরতার কথা মাথায় রেখে তাদের মনে ভয় ছিল, হাতের কাছে পেয়ে মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠতে পারেন।

১৮ ডিসেম্বর নওগাঁ মুক্ত দিবস উপলক্ষে আজ স্থানীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলার আয়োজন করেছে। আছে প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি।