ভাঙনের কয়েকদিন আগে কবর জিয়ারত করছেন কয়েকজন বাসিন্দা
ভাঙনের কয়েকদিন আগে কবর জিয়ারত করছেন কয়েকজন বাসিন্দা

জিয়ারত করতে গিয়ে দেখেন বাবার কবরের চিহ্নও নেই, কান্না থামছে না জাকির হোসেনের

প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের পর বাবার কবর জিয়ারত করতেন জাকির হোসেন (৬২)। এ ছাড়া কোনো উপলক্ষে কিংবা বাবাকে মনে পড়লেই তিনি বাবার কবরের সামনে যেতেন। তবে এটি আর এখন সম্ভব নয়। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে তিনি গিয়ে দেখেন, বাবার কবরের চিহ্নটুকুও নেই। ভাঙনে সাগরে বিলীন হয়ে গেছে কবর। এর পর থেকেই কান্না যেন থামছে না জাকির হোসেনের।

জাকির হোসেন চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের বিচ্ছিন্ন ইউনিয়ন উড়িরচরের বাসিন্দা। ২০১২ সালে তাঁর বাবা মো. আলাউদ্দিনের মৃত্যু হয়। এরপর তাঁকে দাফন করা হয় উড়িরচরের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কলোনি বাজার মসজিদের কবরস্থানে। সর্বশেষ গত শুক্রবার বাবার কবর জিয়ারত করেন জাকির হোসেন। এর চার দিন না পেরোতেই কবরটির অস্তিত্ব মুছে যাবে, তা তিনি কল্পনাও করেননি।

জাকির হোসেন

জাকির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বুকের ভিতরটা মোচড় দি (দিয়ে) উডে (ওঠে)। চার বছর আগে সাগরে বাড়ি হারাইছি। কিন্তু আঁত্তুন (আমার কাছে) এত খারাপ লাগে ন। আব্বার কবরটা ভাঙনের পর বুকের মইধ্যে যেন পাথর চাপি বসছে। এখন আব্বার কবরের চিহ্ন আর নাই। এই জীবনে আর আব্বার কবরে যাই জিয়ারতের সুযোগ থাইকল না।’

বাকি জনমে কবর সামনে রেখে দোয়া করার সুযোগ তো আর পাব না। উড়িরচরে তিনবার ভিটা আর জমিজিরাত হারাইলাম, আবার তৈয়ার করলাম। কিন্তু কবর তো আর তৈয়ার কইরতে পারব না।
জাকির হোসেন, সন্দ্বীপের উড়িরচরের বাসিন্দা

উড়িরচর সন্দ্বীপ উপজেলা শহর থেকে অন্তত ২০ কিলোমিটার উত্তর–পশ্চিমে নোয়াখালী উপকূলের কাছাকাছি অবস্থিত। বর্তমানে দ্বীপটির আয়তন প্রায় ১২০ বর্গকিলোমিটার। ১৯৭৫ সালের পর সন্দ্বীপে ভিটেমাটি হারানো কয়েকটি পরিবার সেখানে গিয়ে বসতি গড়ে। তাঁদেরই একজন ছিলেন আলাউদ্দিন।

জাকির হোসেন জানান, তাঁর বাবা ১৯৭৯ সালে সন্দ্বীপের কালাপানীয়া ইউনিয়ন থেকে উড়িরচরে গিয়ে ঘর তোলেন। তখন কালাপানীয়ায় তীব্র ভাঙন চলছিল। ১৯৯৫ সালের দিকে সেখানে ভাঙন থেমে যায়। পরে ওই এলাকায় বিস্তীর্ণ নতুন ভূমি জেগে ওঠে।

কালাপানীয়ায় ভাঙনে দিশাহারা অনেক পরিবার সে সময় নতুন জেগে ওঠা উড়িরচরে বসতি গড়ে। আলাউদ্দিনও পরিবার নিয়ে সেখানে চলে যান। তখন জাকিরের বয়স ১৫ বছর। তিনি বলেন, উড়িরচর তখন ছিল বিরানভূমি। চারদিকে তেমন কিছুই ছিল না। সময়ের সঙ্গে সেই ভূমিতেই জনবসতি গড়ে ওঠে। ধান, মাছ ও নানা ধরনের গাছপালায় সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে উড়িরচর।

উড়িরচর সন্দ্বীপ উপজেলা শহর থেকে অন্তত ২০ কিলোমিটার উত্তর–পশ্চিমে নোয়াখালী উপকূলের কাছাকাছি অবস্থিত। বর্তমানে দ্বীপটির আয়তন প্রায় ১২০ বর্গকিলোমিটার। ১৯৭৫ সালের পর সন্দ্বীপে ভিটেমাটি হারানো কয়েকটি পরিবার সেখানে গিয়ে বসতি গড়ে।

জাকির হোসেন জানান, তাঁর বাবা চার ভাইকে খাইয়ে–পড়িয়ে বড় করেছেন। বিরানভূমিতে ঘর বেঁধে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে পরিবার নিয়ে টিকে ছিলেন তিনি। বয়সের ভারে কর্মক্ষমতা হারানোর পর ২০১২ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। বাবার সংগ্রামী জীবনের কথা মনে পড়লে এখনো তাঁর কান্না আসে।

জাকির হোসেন আরও বলেন, ‘বাকি জনমে কবর সামনে রেখে দোয়া করার সুযোগ তো আর পাব না। উড়িরচরে তিনবার ভিটা আর জমিজিরাত হারাইলাম, আবার তৈয়ার করলাম। কিন্তু কবর তো আর তৈয়ার কইরতে পারব না।’

দক্ষিণ তীরের ভাঙনে তিনবার ঘর ও জমি হারিয়ে উত্তর দিকে সরে গেছেন জাকির হোসেন। এখন তাঁর বাড়ি উড়িরচরের কামাল মার্কেট এলাকায়। ২০২৩ সালে উড়িরচরের সীমানা নির্ধারণের পর থেকে এলাকাটি নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের অংশ হিসেবে চিহ্নিত। কলোনি বাজার থেকে কামাল মার্কেট কিছুটা দূরে হলেও বাবার কবরের টানে গতকাল সেখানে ছুটে এসেছিলেন জাকির। চেয়েছিলেন শেষবারের মতো কবরটি দেখতে। কিন্তু তার আগেই সাগরে বিলীন হয়ে গেছে সেটি।

অবশ্য শুধু জাকির হোসেন নন। গতকাল কবরস্থান এলাকায় ছুটে এসেছিলেন তাঁর মতো আরও অনেকে। তাঁদের কেউ এসেছিলেন মা–বাবার কবর দেখতে, কেউ ভাই–বোন কিংবা অন্য স্বজনের। কিন্তু তাঁরা কবরের আর কোনো চিহ্ন খুঁজে পাননি।

ভেঙে যাওয়া কবরস্থান। গতকাল তোলা

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দা নুর নবি জাকির হোসেনের একটি ভিডিও ধারণ করে নিজের ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করেছেন। ভিডিওতে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জাকিরকে বলতে শোনা যায়, ‘এখানে আমার আব্বার কবর ছিল।’ এরপর সাগরের পানির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘এই যে, এই বরাবর ছিল।’

নুর নবী রবিন প্রথম আলোকে বলেন, কলোনি বাজার মসজিদের কবরস্থানটি উড়িরচরের সবচেয়ে পুরোনো ও বড় কবরস্থান। গত সোমবার রাতে প্রায় পুরো কবরস্থান বিলীন হয়ে গেছে। এর পর থেকে জাকির হোসেনের মতো শত শত মানুষের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে উড়িরচরের বাতাস। কিন্তু এসব মানুষের কান্না ও ভোগান্তি দেখার কেউ নেই।

বিলীনের মুখে মসজিদ, বাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

কবরস্থানের পাশাপাশি কলোনি বাজার মসজিদও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। গতকাল মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে ইট খুলে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এরপর এলাকাবাসী এসে ইট খুলতে শুরু করেন। অন্য জায়গায় মসজিদ নির্মাণের কাজে এসব ইট ব্যবহার করা হবে।

স্থানীয় বাসিন্দা মিলাদ হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা কার কাছে অধিকার চাইব, কাকে বিচার দেব জানি না। একটি জনপদের কয়েক যুগের সব সম্পদ, মাটির সঙ্গে তৈরি হওয়া সব বন্ধন ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাচ্ছে। দুই–এক দিনেই হয়তো বিলীন হবে কলোনি বাজার। তারপর ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দ্বীপবন্ধু মুস্তাফিজুর রহমান মাদ্রাসা ও উড়িরচর মাধ্যমিক বিদ্যালয় বিলীন হয়ে যাবে। আমাদের কিছুই তো আর থাকল না।’

সন্দ্বীপের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, উড়িরচরের ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি নিজে গিয়ে ভাঙনের তীব্রতা দেখে এসেছেন। সেখানে রাতারাতি সব হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে মানুষ। বিষয়টি তিনি জেলা প্রশাসককে জানিয়েছেন।