মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড চট্টগ্রাম
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড চট্টগ্রাম

এসএসসি পরীক্ষা

মিথ্যা তথ্য দিয়ে ধর্ম ও চারুকলার শিক্ষক হলেন বাংলার প্রধান পরীক্ষক

তাঁদের কেউ ধর্ম, কেউ চারুকলা পড়ান। আবার কেউ শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক। তবে এসএসসি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের জন্য তাঁদের নাম এসেছে বাংলা দ্বিতীয় পত্র এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ের প্রধান পরীক্ষক হিসেবে। চলতি বছর চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি পরীক্ষার প্রধান পরীক্ষকদের তালিকায় এমন সাতজন শিক্ষকের তথ্য পাওয়া গেছে। পরে তাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে বোর্ড।

শিক্ষা বোর্ড সূত্র জানায়, সাধারণত বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের মতো বিষয়ে প্রায় ৩১০ জন পরীক্ষক এবং ২০ থেকে ২৭ জন প্রধান পরীক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। অন্যান্য বিষয়ে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা অনুযায়ী পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষক নিয়োগ করা হয়। এ জন্য শিক্ষকদের ইলেকট্রনিক টিচার্স ইনফরমেশন ফরমে (ইটিআইএফ) আবেদন করতে হয়। প্রতি খাতা মূল্যায়নের সম্মানী ৪০ টাকা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলা দ্বিতীয় পত্রের প্রধান পরীক্ষকের তালিকায় ভিন্ন বিষয়ের অন্তত তিনজন শিক্ষক ছিলেন। এঁদের মধ্যে একজন চারুকলার, একজন ধর্ম বিষয়ের ও একজন হিসাববিজ্ঞানের শিক্ষক। বাংলা প্রথম পত্র ও বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়েও ভিন্ন তথ্য দিয়ে প্রধান পরীক্ষক হওয়া আরও চারজনকে চিহ্নিত করেছে বোর্ড। ইংরেজি বিষয়েও এমন অভিযোগ রয়েছে। যদিও বোর্ডসংশ্লিষ্ট সবার নাম প্রকাশ করেনি।

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের বর্তমান ও সাবেক তিন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিবছরই কেন্দ্রসচিব, পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক তদবির থাকে। গত বছরও কয়েকজন শিক্ষক এভাবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। এ বছর তাঁদের ‘সি ক্যাটাগরি’ দেখিয়ে বাদ দেওয়া হয়েছে। তথ্য গোপনকারীদের বিরুদ্ধেও একই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রধান পরীক্ষকদের খাতা পুনর্মূল্যায়ন, নম্বর সমন্বয় ও পরীক্ষকদের মূল্যায়ন তদারকির ক্ষমতা থাকে। ফলে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ভিন্ন বিষয়ের শিক্ষক নিয়োগ পেলে মূল্যায়নের মান, নির্ভুলতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার ঘাটতি থাকলে তা পরীক্ষার্থীদের ফলাফলেও প্রভাব ফেলতে পারে।

শিক্ষকসংকটের কারণে অনেক বিদ্যালয়ে এক বিষয়ের শিক্ষককে অন্য বিষয়ও পড়াতে হয়। সে কারণ দেখিয়ে প্রধান শিক্ষকেরা তাঁদের নাম পাঠান। কিন্তু শারীরিক শিক্ষার শিক্ষককে বাংলা বিষয়ের জন্য সুপারিশ করার সুযোগ নেই। যেসব তথ্য পাওয়া গেছে, সবগুলোই বাদ দেওয়া হয়েছে
মোহাম্মদ আবদুল মন্নান, উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (মাধ্যমিক), চট্টগ্রাম বোর্ড

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, অন্য বিষয়ের শিক্ষক প্রধান পরীক্ষক হওয়ার সুযোগ নেই। নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে আবেদন করার পর তথ্য যাচাই করেন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক। অন্তত সাতজন শিক্ষকের তথ্যে গরমিল পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাঁদের ভবিষ্যতেও বাদ রাখা হবে।

অন্য বিষয়ের শিক্ষক, খাতা কাটে শিক্ষার্থী

পরীক্ষা শাখার এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এসএসসি স্তরে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পাঠদানকারী শিক্ষকদেরই শুধু সেই বিষয়ের পরীক্ষক হিসেবে ইটিআইএফে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। অস্থায়ী, খণ্ডকালীন, শরীরচর্চা শিক্ষক, গ্রন্থাগারিক ও অফিস সহকারীরা এ সুযোগ পাবেন না। যেসব শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না, তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করলে দায় নিতে হবে প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে।

চট্টগ্রাম বোর্ডের বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ের প্রধান পরীক্ষকদের প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নেয় প্রথম আলো। এতে পাঁচটি বিদ্যালয়ের ভিন্ন বিষয়ের শিক্ষককে অন্য বিষয়ের প্রধান পরীক্ষক হিসেবে পাওয়া যায়। তাঁদের মধ্যে একজন চারুকলার, একজন ধর্মের, একজন হিসাববিজ্ঞানের এবং দুজন শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক। আর দুজন অন্য শিক্ষকের পরিচয় জানা যায়নি। ওই দুই শিক্ষককে প্রধান পরীক্ষক করা হয়েছিল। পরে তাঁদের নাম বাদ দেওয়া হয়। এ ছাড়া একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের দিয়ে বাংলা দ্বিতীয় পত্রের খাতা মূল্যায়ন করিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। খাতা মূল্যায়নের ছবি পাওয়ায় ওই শিক্ষককেও বাদ দিয়েছে বোর্ড। বোর্ড জানিয়েছে, এসএসসি পরীক্ষা শেষে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে।

শিক্ষা বোর্ড সূত্র জানায়, সাধারণত বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের মতো বিষয়ে প্রায় ৩১০ জন পরীক্ষক এবং ২০ থেকে ২৭ জন প্রধান পরীক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। অন্যান্য বিষয়ে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা অনুযায়ী পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষক নিয়োগ করা হয়। এ জন্য শিক্ষকদের ইলেকট্রনিক টিচার্স ইনফরমেশন ফরমে (ইটিআইএফ) আবেদন করতে হয়। প্রতি খাতা মূল্যায়নের সম্মানী ৪০ টাকা।

চট্টগ্রাম বোর্ডের উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (মাধ্যমিক) মোহাম্মদ আবদুল মন্নান বলেন, শিক্ষকসংকটের কারণে অনেক বিদ্যালয়ে এক বিষয়ের শিক্ষককে অন্য বিষয়ও পড়াতে হয়। সে কারণ দেখিয়ে প্রধান শিক্ষকেরা তাঁদের নাম পাঠান। কিন্তু শারীরিক শিক্ষার শিক্ষককে বাংলা বিষয়ের জন্য সুপারিশ করার সুযোগ নেই। যেসব তথ্য পাওয়া গেছে, সবগুলোই বাদ দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও ভুল তথ্য দিয়ে অন্য বিষয়ের খাতা মূল্যায়নের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি শিক্ষার্থীদের দিয়ে খাতা মূল্যায়নের অভিযোগও পাওয়া গেছে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, কেউ কেউ তথ্য গোপন করে, আবার কেউ রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষক হন। গত বছর অনেকে বাদ গেছেন। এ বছর শনাক্ত হওয়া সবাইকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

আগামী বুধবার চলতি বছরের এসএসসির তত্ত্বীয় পরীক্ষা শেষ হবে। এখন পর্যন্ত চট্টগ্রাম বোর্ড সাতটি বিষয়ের প্রধান পরীক্ষকের তালিকা প্রকাশ করেছে। বাকিগুলোর প্রক্রিয়া চলছে। বাংলা দ্বিতীয় পত্রের তালিকায় থাকা এক হিসাববিজ্ঞানের শিক্ষককে প্রধান পরীক্ষক করতে রাজনৈতিক তদবির ছিল বলে জানা গেছে। পরে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব মোহাম্মদ জহিরুল হক বলেন, পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষক নিয়োগে নীতিমালা অনুসরণ বাধ্যতামূলক। যাঁদের তথ্যে গরমিল পাওয়া গেছে, তাঁদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি আরও যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাজনৈতিক তদবিরের কোনো সুযোগ নেই। বোর্ড এসব ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থানে আছে।