
মাদলের তালে তালে নাচছেন নারী-পুরুষ। উঠানে জড়ো হয়েছে কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীরা। কারও হাতে বাদ্যযন্ত্র, কারও কণ্ঠে গান। চারপাশে উৎসবের আমেজ। তবে উৎসবের মাঝেও চোখে পড়ে একটি ঘাটতি—যে গাছকে ঘিরে এই আয়োজন, সেই কারামগাছই নেই।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার দাতিনাখালি মুন্ডাপাড়ায় এবার তাই কারামগাছের বদলে পূজার স্থানে রাখা হয়েছিল পিপুলগাছের একটি ডাল। গত মঙ্গলবার শেষ হয় মুন্ডাদের ঐতিহ্যবাহী পাঁচ দিনব্যাপী কারাম উৎসব।
দাতিনাখালির বাসিন্দা দীপালি মুন্ডা বলেন, ‘স্বামী-সন্তানের মঙ্গল কামনায় কারাম উৎসবে গিয়েছিলাম। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকেই করম দেবতার পূজার রীতি শিখেছি। কিন্তু এলাকায় কারামগাছ না থাকায় এবার পিপুলের ডাল পুঁতে পূজা করতে হয়েছে।’
মুন্ডা সম্প্রদায়ের মানুষের ভাষ্য, উপকূলের লবণাক্ততা ও অতিরিক্ত গরমে এলাকায় কারামগাছ টিকছে না। যে গাছ তাঁদের ধর্মীয় বিশ্বাস, ফসল ও পারিবারিক মঙ্গলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, সেটি এখন আনতে হয় দূরের জেলা জয়পুরহাট থেকে। এবার সেটিও সময়মতো আসেনি। তাই পিপুলের ডাল দিয়েই উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয়েছে।
আজ রোববার বিষয়টি নিয়ে কথা হয় সুন্দরবন আদিবাসী মুন্ডা সংস্থার (সামস) নির্বাহী পরিচালক কৃষ্ণপদ মুন্ডার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এবার জয়পুরহাট থেকে কারামগাছ আনার কথা ছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দলটি আসতে পারেনি। তাই বিকল্প হিসেবে পিপুলগাছের একটি ডাল দিয়ে পূজা করা হয়েছে। কারামগাছ ও পিপুলগাছ কিছুটা সমগোত্রীয় হওয়ায় আলোচনার ভিত্তিতে সবাই এতে রাজি হন।’
এমন পরিস্থিতি এবারই প্রথম নয়। ২০২৪ সালেও জয়পুরহাট থেকে কারামগাছ এনে শ্যামনগরে উৎসব করতে হয়েছিল। স্থানীয়ভাবে কারামগাছের চারা লাগানোর চেষ্টাও হয়েছিল। জয়পুরহাট থেকে আনা একটি চারা মুন্ডাপাড়ায় লাগানোর পর পাতাও মেলেছিল। প্রায় দুই মাস পর গরমে সেটি মারা যায়। কৃষ্ণপদ মুন্ডা বলেন, ‘লবণাক্ততা আর অতিরিক্ত গরম—দুটিই এখানকার কারামগাছের জন্য সমস্যা।’
কারাম উৎসব মুন্ডাদের কাছে শুধু এক দিনের পূজা নয়। আয়োজনের সামর্থ্য অনুযায়ী এটি তিন থেকে সাত দিন পর্যন্ত চলে। পূজার স্থানে বিভিন্ন বীজ, বিশেষ করে শর্ষেসহ নানা বীজ দেওয়া হয়। এরপর স্থাপন করা হয় কারামের ডাল। পূজারি বা পাহান কারাম উৎসবের সঙ্গে সম্পর্কিত গল্প বলেন। ফসল, পরিবার ও ভবিষ্যতের মঙ্গল কামনার এই আয়োজনের পর শুরু হয় নাচ-গান।
শ্যামনগরের এই গল্পের সঙ্গে মিলে যায় খুলনার কয়রার মুন্ডাপাড়াগুলোর গল্পও। তবে সেখানে কারাম উৎসবের স্মৃতি এখন অনেকটাই অতীত। ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার আগে কয়রার বিভিন্ন মুন্ডাপাড়ায় আয়োজন করে কারাম উৎসব হতো। পূজা, নাচ-গান ও খাওয়াদাওয়ায় মুখর থাকত পাড়া। আইলার পর বাঁধ ভেঙে ঢুকে পড়া নোনা পানি বদলে দেয় সেই চিত্র। ধীরে ধীরে কমতে থাকে কারামগাছ। একপর্যায়ে গাছ না থাকায় উৎসবও বন্ধ হয়ে যায়।
কয়রার নলপাড়া গ্রামের নমিতা রানী মুন্ডা বলেন, ‘২০০৯ সালের আইলার আগেই শেষবার হইছিল। এরপর আর হয়নি। কারামগাছই তো নেই, উৎসব হবে কীভাবে?’
কারাম উৎসবের সঙ্গে মুন্ডাদের একটি লোককথাও জড়িয়ে আছে। ধর্মা ও কর্মা দুই ভাই। ধর্মা কারামগাছের পূজা করতেন, কর্মা করতেন না। একসময় কর্মা সেই গাছ নদীতে ফেলে দেন। এরপর নেমে আসে বিপদ। পরে গাছ ফিরিয়ে এনে পূজা করলে বিপদ কেটে যায়—এমন গল্পই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বলে আসছেন মুন্ডারা।
তবে নতুন প্রজন্মের কাছে সেই উৎসবের স্মৃতি ক্রমেই ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। কয়রার তরুণ সাধন কুমার মুন্ডা নিজের চোখে কখনো কারাম উৎসব দেখেননি। বয়স্কদের মুখে শুনেছেন শুধু। তিনি বলেন, ‘শুনেছি শ্যামনগরের দিকে উৎসবটা টিকে আছে। আগামী বছর দেখতে যাওয়ার ইচ্ছে আছে।’
মুন্ডা সম্প্রদায় নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা লেখক ও গবেষক পীযূষ বাউলিয়া পিন্টু বলেন, আইলার পর উপকূলের ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা বেড়েছে। এর প্রভাবে অনেক উদ্ভিদ টিকে থাকতে পারছে না। কারাম ও কুচগাছও এর মধ্যে রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, কারামগাছের গুরুত্ব শুধু ধর্মীয় নয়, পরিবেশগতও। এর ফুল বিভিন্ন পরাগবাহী পতঙ্গকে আকর্ষণ করে।
সুন্দরবন আদিবাসী মুন্ডা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শ্যামনগর ও আশপাশের এলাকায় আড়াই থেকে তিন হাজার মুন্ডা মানুষের বসবাস। প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রেখেই তাদের জীবনযাপন ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। কারাম উৎসব সেই সংস্কৃতিরই গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মুন্ডা সম্প্রদায়ের পূজারি নারায়ণ চন্দ্র মুন্ডা বলেন, ‘একসময় যে গাছের ডালকে ঘিরে মুন্ডাপাড়ায় রাতভর নাচ-গান হতো, সেই গাছ এখন দূরের জেলা থেকে আনতে হয়। এবার সেটিও না আসায় উৎসব হয়েছে পিপুলের একটি ডালে। গাছটি আবার লাগালে উপকূলের মাটিতে বাঁচবে কি না, তা জানি না। তবে মাদলের তালে যে উৎসব এবার মুন্ডাপাড়ায় ফিরেছে, সেটি যেন আর হারিয়ে না যায়—এটাই চাওয়া আমাদের।’