
মাত্র এক টাকায় শিক্ষার আলো ছড়ানোর স্বীকৃতি মিলল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে। গাইবান্ধার ‘এক টাকার মাস্টার’ হিসেবে পরিচিত লুৎফর রহমানকে বিশ্ব শিক্ষক দিবসে বিশেষ সম্মাননা দিয়েছে সরকার। ৫২ বছর ধরে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়িয়ে আসা মানুষটির হাতে সম্মাননা তুলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আজ সোমবার দেশের ১০০ জন গুণী শিক্ষকের সঙ্গে তাঁকেও সম্মাননা দেওয়া হয়। সম্মাননাপ্রাপ্ত প্রত্যেক শিক্ষককে দুই লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সামনেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন লুৎফর রহমান।
লুৎফর রহমানের বক্তব্য শুনে প্রধানমন্ত্রী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক না হলেও তাঁকে অবসর ভাতা দেওয়ার ঘোষণা দেন। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এ ঘোষণা দেন।
প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সম্মাননা ও উপহার পেয়ে আমি খুব খুশি এবং আনন্দিত। যত দিন বেঁচে থাকব এবং সুস্থ থাকব, আমি শিশুদেরকে পড়িয়ে যাব। আমার জন্য অবসর ভাতা ঘোষণা করায় আমি খুশি। এতে আমার অনেক উপকার হবে।শিক্ষক লুৎফর রহমান
লুৎফর রহমান দীর্ঘ ৫২ বছর ধরে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাত্র এক টাকার বিনিময়ে পড়িয়ে আসছেন। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষকতা না করেও দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে যাচ্ছেন এই শিক্ষাসেবা। তাঁর উদ্যোগে গাইবান্ধায় বহু সুবিধাবঞ্চিত শিশু শিক্ষার সুযোগ পেয়েছে। দীর্ঘদিনের এই অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে বিশেষ ক্যাটাগরিতে সম্মাননা দেওয়া হয়।
সম্মাননা পাওয়ার পর ঢাকা থেকে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে লুৎফর রহমান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সম্মাননা ও উপহার পেয়ে আমি খুব খুশি এবং আনন্দিত। যত দিন বেঁচে থাকব এবং সুস্থ থাকব, আমি শিশুদেরকে পড়িয়ে যাব। আমার জন্য অবসর ভাতা ঘোষণা করায় আমি খুশি। এতে আমার অনেক উপকার হবে।’
লুৎফর রহমানকে নিয়ে চলতি বছরের ১৫ মে প্রথম আলোতে ‘৭৮ বছর বয়সেও ছড়াচ্ছেন আলো’ শিরোনামে ভিডিও প্রতিবেদন প্রচারিত হয়। এর আগে ২০১৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ‘আলো ছড়াচ্ছেন এক টাকার মাস্টার’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ করা হয়। এ ছাড়া গত ২৭ মে তাঁকে উপহার পাঠান প্রধানমন্ত্রী।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার বাগুড়িয়া গ্রামের লুৎফর রহমান বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। কিন্তু তাঁর পাঠদানশক্তি প্রচণ্ড। প্রায় ৫২ বছর আগে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছে দৈনিক দুই মুষ্টি চাল নিয়ে টিউশনি শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে দৈনিক নেন এক টাকা। এখনো এক টাকা ফিতেই পড়াচ্ছেন তিনি। এভাবে প্রতিদিন গড়ে ৬০ জন শিশুশিক্ষার্থীকে পড়িয়ে মাসিক পাচ্ছেন ১ হাজার ৮০০ টাকা। তা দিয়েই কোনোমতে সংসার চলছে।
তাঁর নাম লুৎফর রহমান হলেও স্থানীয়ভাবে তিনি ‘এক টাকার মাস্টার’ নামে পরিচিত। শিক্ষার আলো ছড়ানোর জন্য তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে একাধিক পুরস্কারও পেয়েছেন। ভাইরাল হয়েছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
গাইবান্ধা শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দুরে বাগুড়িয়া গ্রাম। সদর উপজেলার গিদারি ইউনিয়নের অন্তর্গত গ্রামটির ভেতর দিয়ে নির্মিত ব্রক্ষপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ। বাঁধের দুই ধারে নদীভাঙা মানুষের বসবাস। বেশির ভাগ মানুষই দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন। বাঁধের পাশেই লূৎফর রহমান বসবাস করেন।
লুৎফর রহমান জানান, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছে আগে দৈনিক দুই মুষ্টি চাল নিতেন। পরবর্তী সময়ে এক টাকা করে নেওয়া শুরু করেন। এখনো এক টাকাই নিচ্ছেন। প্রতিদিন সকালে শুরু করেন, চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। সাত দফায় প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির প্রায় ৬০ জনকে পড়ান। মাসে পান মোট ১ হাজার ৮০০ টাকা।
লুৎফর রহমানের এলাকাটি দারিদ্র্যপীড়িত। এখানকার বেশির ভাগ মানুষ নদীভাঙনে নিঃস্ব। একসময় তাঁদের জমিজমা ছিল। এখন সরকারি জায়গা, বাঁধ ও অন্যের জায়গায় তাঁরা বসবাস করছেন। বেশির ভাগ মানুষ দিনমজুর, জেলে ও রিকশা চালানোর কাজ করেন। তাঁরা যে আয় করেন, তা দিয়ে নিজের সংসারই চলে না। তাই ছেলেমেয়েদের পড়াতেই চান না।
শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কেন এক টাকা নেন, এমন প্রশ্নে লুৎফর রহমান প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘বিনা মূল্যে পড়ালে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ থাকে না। তাই আমি এক টাকা ফি নিয়ে পড়াচ্ছি।’
লুৎফর রহমান আরও বলেন, ‘সবচেয়ে বড় কথা, গরিব ও অবহেলিত এলাকায় জ্ঞানের আলো ছড়াতে পারছি, এটাই আমার লাভ। দিনমজুর, রিকশাচালকের ছেলে-মেয়েরা তো মানুষ হবে। যত দিন সুস্থ থাকব, তত দিন পাঠদান করে যাব। আমার কাছে পড়াশোনা করে অনেকেই ভালো চাকরি পেয়েছে।’
লুৎফর রহমান ১৯৭০ সালে ফুলছড়ি উপজেলার গুণভড়ি উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ১৯৭৪ সালে গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এইচএসসি পাস করে চাকরি পাননি। ১৯৭৫ সালে বিয়ে করেন।
একসময় লুৎফর রহমানের ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া গ্রামে বাড়ি ছিল। তাঁর বাবার ১০০ বিঘা জমি, ৪ বিঘা জমিতে বসতভিটা ছিল। নদীভাঙনে সব হারিয়েছেন। পরে তিনি বাগুড়িয়া গ্রামে আশ্রয় নেন। এখানে তিন শতাংশ বসতভিটায় টিনের ঘরে বসবাস। তাঁর দুই ছেলে, দুই মেয়ে। দুই মেয়ে লিম্মি বেগম ও লিপি বেগমের বিয়ে হয়েছে।
দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে লাভলু মিয়া ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালান। ছোট ছেলে মশিউর রহমান একটি কোচিং সেন্টারে চাকরি করেন। বর্তমানে দুই ছেলে, স্ত্রী লতিফুল বেগমকে নিয়ে ছয় সদস্যের সংসার লুৎফর রহমানের।