
দুই মেয়ে যখন সকালে বিদ্যালয়ের উদ্দেশে রওনা দিত, তখন বাড়ির বারান্দায় বসে দুজনকে হাত নেড়ে বিদায় জানাতেন বাবা সুনীল কান্তি দাশ (৫২)। সেখানে বসেই অপেক্ষায় থাকতেন মেয়েরা কখন ফিরবে। পক্ষাঘাতে পা অসাড় হয়ে পড়া সুনীলের গত রোববারের সকালটাও এভাবেই শুরু হয়েছিল। তবে বিকেলটা অন্য দিনের মতো হয়নি। বিদ্যালয় থেকে আর জীবিত অবস্থায় ফিরতে পারেনি তাঁর ষষ্ঠ শ্রেণিপড়ুয়া ছোট মেয়ে। বাসের ধাক্কায় আহত হওয়ার পর রাতে একটি হাসপাতালে মৃত্যু হয় মেয়ের।
দুর্ঘটনায় মেয়ের মৃত্যুর পর থেকেই শোকে অনেকটা দিশাহারা হয়ে পড়েছেন সুনীল কান্তি দাশ। দীর্ঘদিন ওমানে প্রবাসজীবন কেটেছে তাঁর। সেখানে স্ট্রোক করার পর গত বছর দেশে ফেরেন। স্ট্রোকের পর তাঁর একটি পা পুরোপুরি অসাড় হয়ে পড়েছে। অন্য পায়েও তেমন শক্তি পান না। ফলে চলাচল করতে না পারায় সারা দিন বাড়ি বসে কিংবা শুয়েই সময় কাটাতে হয় তাঁকে।
দুপুরে এলাকার একজন ফেসবুকে ঈশার রক্তাক্ত ছবি দিয়ে দুর্ঘটনার কথা লেখেন। খবর পেয়ে আমি ছুটে গেছি। অ্যাম্বুলেন্সে মেয়েকে নিয়ে নগরের হাসপাতালে ছুটে যাই। আশা ছিল, মেয়েটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবে। আমার মেয়েটি আর ফিরল না।উষা রানী দাশ, নিহত ঈশার মা।
সুনীল কান্তি দাশের বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার ছদাহা ইউনিয়নের মিঠার দোকান এলাকার নাথপাড়ায়। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়া তাঁর মেয়ের নাম ঈশা রানী দাশ (১২)। বিদ্যালয়ে টিফিনের বিরতিতে মহাসড়ক পেরিয়ে শিঙাড়া কিনতে দোকানে যাচ্ছিল ঈশা। এ সময় চট্টগ্রামমুখী একটি বাস তাকে ধাক্কা দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় ঈশাকে নেওয়া হয় নগরের একটি হাসপাতালে। পরে রাতে সেখানে তার মৃত্যু হয়।
ঈশা পড়াশোনা করত ছদাহার কেফায়েত উল্লাহ কবির আহমদ উচ্চবিদ্যালয়ে। তার বড় বোন আদিত্যা রানী দাশও (১৬) একই বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। একসঙ্গে বিদ্যালয়ে যেত দুই বোন, ফিরতও একসঙ্গে।
সাতকানিয়ার কেরানীহাট স্টেশন থেকে চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক ধরে পাঁচ কিলোমিটার দক্ষিণে ছদাহা ইউনিয়নের মিঠার দোকান এলাকা। সেখান থেকে পিচঢালা ফকিরহাট সড়ক ধরে এক কিলোমিটার পূর্বে যাওয়ার পর নুনু চৌধুরী বাজার সড়ক নামে আরেকটি গ্রামীণ রাস্তা। সেই রাস্তা ধরে আরও ৫০০ মিটার যাওয়ার পর নাথপাড়া।
গত সোমবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, একতলা পাকা ঘর সুনীল কান্তি দাশের। ঘরের সামনে একটি চেয়ারে বসে রয়েছেন তিনি। কয়েকজন প্রতিবেশী তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ঘরের উঠানে বসে মেয়ের জন্য আহাজারি করছেন সুনীলের স্ত্রী উষা রানী দাশ। মায়ের কান্না দেখে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল মেয়ে আদিত্যা।
মেয়ে ঈশার জন্য আহাজারি করতে করতে উষা রানী দাশ বলেন, ‘প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময়, আবার ফিরে এসে, মেয়েটা প্রথমে আমাকে জড়িয়ে ধরত। আমার হাতের বানানো নাশতা খেয়েই স্কুলের জন্য বিদায় নিয়েছিল সে। তার ফেরার অপেক্ষায় ছিলাম। দুপুরে এলাকার একজন ফেসবুকে ঈশার রক্তাক্ত ছবি দিয়ে দুর্ঘটনার কথা লেখেন। খবর পেয়ে আমি ছুটে গেছি। অ্যাম্বুলেন্সে মেয়েকে নিয়ে নগরের হাসপাতালে ছুটে যাই। আশা ছিল, মেয়েটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবে। আমার মেয়েটি আর ফিরল না।’
বাড়িতে কথা হয় ঈশার চাচা স্বপন কান্তি দাশের সঙ্গে। স্থানীয় ঠাকুরদিঘি পাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তিনি। প্রথম আলোকে তিনি জানান, অসুস্থ হয়ে প্রবাস থেকে দেশে ফেরার পর সুনীল কান্তি দাশের পরিবারে অভাব–অনটন দেখা দেয়। তবু দুই মেয়ের পড়াশোনায় যাতে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে, সেই চেষ্টা করে আসছিলেন সুনীল। মেয়েরা পড়ালেখা করে প্রতিষ্ঠিত হবে, সেই আশা ছিল তাঁর। এর মধ্যে একটি মেয়েকে এভাবে দুর্ঘটনায় হারাতে হলো।
কেফায়েত উল্লাহ কবির আহমদ উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আতিকুর রহমান বলেন, দুপুরের বিরতির সময় ঈশা স্কুল থেকে বের হয়। এ সময় চট্টগ্রামমুখী স্টার লাইন পরিবহনের একটি বাস তাকে ধাক্কা দেয়। স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে নগরের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং সেখানে তার মৃত্যু হয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বাড়ি থেকে টিফিন নিয়েই বিদ্যালয়ে গিয়েছিল ঈশা। সেই খাবার খায়নি। শিঙাড়া তার খুব পছন্দ ছিল। তাই দুপুরের বিরতিতে বিদ্যালয়ের অদূরে একটি দোকান থেকে শিঙাড়া কিনতে বের হয়েছিল। তবে দোকানে যাওয়ার পথেই একটি বাস তাকে ধাক্কা দেয়।
ঈশার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। দুর্ঘটনার প্রতিবাদে তাঁরা প্রায় আড়াই ঘণ্টা চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক অবরোধ করেন। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী বাসটিও ভাঙচুর করা হয়।