
তখনো সেভাবে সকাল হয়নি। প্রত্যন্ত গ্রামের বাড়ি থেকে মেয়েকে নিয়ে বেরিয়েছেন মা। প্রথমে ইজিবাইক, এরপর ভ্যান, আবার ইজিবাইক—তিনবার যানবাহন বদলে আজ সোমবার সকাল সাড়ে আটটার আগেই বাগেরহাটের স্বাধীনতা উদ্যানে পৌঁছান সুরাইয়া জাহান ও তাঁর মেয়ে সাজিয়া শাহারিয়ার ছোঁয়া।
সাজিয়া এ বছর মোরেলগঞ্জ উপজেলার সুরেন্দ্রনাথ স্মৃতি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। বিদ্যালয়টির ১১ পরীক্ষার্থীর মধ্যে একমাত্র জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী সে। খুলনার সরকারি পাইওনিয়ার মহিলা কলেজে ভর্তি হয়েছে সাজিয়া। কলেজের ক্লাস এখনো শুরু হয়নি। এরই মধ্যে সে খুলনায় মেসে উঠেছে। একদিন আগে গ্রামের বাড়ি ফিরে মাকে নিয়ে আজ বাগেরহাটে এসেছে শিখো–প্রথম আলোর জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে।
সাজিয়াদের বাড়ি মোরেলগঞ্জ উপজেলার তেলিগাতী ইউনিয়নের হেড়মা বাজার এলাকায়। প্রত্যন্ত এলাকা থেকে মেয়েকে নিয়ে অনুষ্ঠানে আসার কারণ জানতে চাইলে মা সুরাইয়া জাহান বলেন, ‘আমাদের এলাকাটা বেশ প্রান্তিক। সেখান থেকে মেয়েকে নিয়ে এসেছি, ওকে উৎসাহ দিতে। ওদের জন্য এমন আয়োজন সত্যিই খুব দরকার। ওরা যাতে আরও অনুপ্রাণিত হয়।’
সংবর্ধনায় আসতে পেরে উচ্ছ্বসিত সাজিয়া। জানাল, সে প্রকৌশলী হতে চায়। এ জন্য এখন থেকেই পড়াশোনা শুরু করেছে। বইয়ের পড়ার পাশাপাশি নিয়মিত পত্রিকাও পড়া শুরু করেছে। অনলাইনে শিখোর কয়েকটি কোর্সও করতে শুরু করেছে বলে জানায়।
সকাল পৌনে নয়টার আগেই বাগেরহাটের স্বাধীনতা উদ্যান মুখর হয়ে ওঠে কৃতী শিক্ষার্থীদের পদচারণে। আড্ডা আর হইহুল্লোড়ে তৈরি হয় উৎসবের আমেজ। ছোট ছোট দলে শিক্ষার্থীদের আড্ডা চলছিল। দীর্ঘদিন পর স্কুলজীবনের কাছের বন্ধু ও সহপাঠীদের পেয়ে কেউ কেউ জড়িয়ে ধরছিল। কেউ আবার মোবাইল ফোনে সেলফি তুলে মুহূর্তগুলো ধরে রাখছিল স্মৃতিতে।
ফটো বুথের সামনে এমনই একদল শিক্ষার্থীর দেখা মেলে। ছয়জনই ফকিরহাটের শিরিন হক পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এ বছর এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে। তারা হলো মৌলি বিশ্বাস, জয়া আক্তার, আফিয়া ফারজানা, আনিকা তাবাসসুম পিয়া, আফিয়া জান্নাত ও ঈশিতা। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে পুরোনো সহপাঠী জিনিয়া আক্তার। জিনিয়া এ বছর বাগেরহাট সদরের রহিমাবাদ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। ভর্তি হয়েছে পিসি কলেজে।
দীর্ঘদিন পর একসঙ্গে হওয়া এই সাত শিক্ষার্থীর উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। দূর থেকে দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে চিৎকার। কেউ ফটো বুথে ছবি তুলছিল, কেউ গল্পে মেতে উঠছিল। স্কুলজীবনের স্মৃতি যেন আবারও ফিরে এসেছিল কয়েক ঘণ্টার জন্য।
প্রথম আলোর আয়োজনে ও শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত হচ্ছে জিপিএ–৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনা। ‘স্বপ্ন দেখো জীবন গড়ো’ স্লোগান নিয়ে সারা দেশে ২০২৬ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের ৬৪ জেলায় এ সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে।
আয়োজনটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ এবং সহযোগিতায় থাকছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা–গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা।
সংবর্ধনার বাগেরহাট পর্ব আজ জেলার স্বাধীনতা উদ্যানে আয়োজন করা হয়। সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়। বাগেরহাট বন্ধুসভার বন্ধু শহিদুল ইসলাম ইমনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর বাগেরহাট প্রতিনিধি সরদার ইনজামামুল হক।
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক চৌধুরী আবদুর রব বলেন, তরুণেরা ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা এনেছে, ১৯৯১ সালে গণতন্ত্র ফিরিয়েছে এবং ২০২৪ সালে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নে প্রাণ দিয়েছে। তবে কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ এখনো তৈরি হয়নি। সেই বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব তরুণ প্রজন্মকেই নিতে হবে।
চিকিৎসক ও নারী ভ্রমণ প্ল্যাটফর্ম ‘ভ্রমণকন্যা’র সহপ্রতিষ্ঠাতা চিকিৎসক সাকিয়া হক নিজের জিপিএ-৫ পাওয়া এবং প্রথম আলো থেকে পাওয়া সংবর্ধনার স্মৃতি তুলে ধরে শিক্ষার্থীদের সামনে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। জীবনে লক্ষ্য নির্ধারণ এবং সেই লক্ষ্য অর্জনে করণীয় নিয়েও তিনি কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে কৃতী শিক্ষার্থীদের মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থবিদ্যাকে ‘না’ বলতে শপথ পড়ান প্রথম আলোর খুলনার নিজস্ব প্রতিবেদক উত্তম মণ্ডল। তিনি বলেন, জিপিএ-৫ জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তবে একজন মানুষের আসল পরিচয় তৈরি হবে সে মানুষ হিসেবে কী করছে, তার ওপর।