বিএনপির লোগো
বিএনপির লোগো

রংপুরের ৬টি আসন

ঐক্যের অভাব ও সাংগঠনিক দুর্বলতায় ‘সুযোগ’ কাজে লাগাতে পারেনি বিএনপি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিএনপি প্রার্থীরা জয়লাভ করলেও রংপুর জেলার ছয়টি আসনের একটিতেও জয়ের দেখা পাননি। জেলার পাঁচটি আসনে জিতেছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা। আরেকটিতে নির্বাচিত হয়েছেন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী ও এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন।

রংপুরকে বলা হতো জাতীয় পার্টির ঘাঁটি। কিন্তু এবার এই ঘাঁটি দখল করেছে জামায়াত। ফলে রংপুরে জামায়াতের উত্থান নিয়ে যেমন আলোচনা হচ্ছে, তেমনি কথা হচ্ছে বিএনপি প্রার্থীদের পরাজয় নিয়েও। স্থানীয় নেতা–কর্মীরা বলেন, জামায়াতের মতো এবার রংপুরে বিএনপির সুযোগ থাকলেও কাজে লাগাতে পারেনি। অবশ্য তিনটি আসনে ভোট গণনায় কারচুপি ও জালিয়াতির অভিযোগ তুলেছে বিএনপি। রংপুর-৩ (সদর-সিটি), রংপুর-৪ ও রংপুর-৬ আসনে ভোট পুনর্গণনার দাবি জানিয়েছে বিএনপি। তবে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান সাংবাদিকদের কাছে ভোট গ্রহণ ও ভোট গণনায় কোনো অনিয়ম হয়নি বলে দাবি করেন।

নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ হিসেবে রংপুরের বিএনপির স্থানীয় নেতা–কর্মীরা বলেন, দলীয় মনোনয়ন নিয়ে নেতাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, সাংগঠনিক দুর্বলতা ও প্রার্থী বাছাইয়ে ভুল করাই এই সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার কারণ। এসব কারণে বিএনপি প্রার্থীরা শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে জামায়াতের প্রার্থীদের সামনে লড়তে পারেননি।

মহানগর বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, সারা দেশে বিএনপির প্রার্থীরা জয়লাভ করলেও রংপুরে ঐক্যের অভাব ও সাংগঠনিক দুর্বলতা বিএনপি প্রার্থীদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ।

গঙ্গাচড়া উপজেলা ও সিটি করপোরেশনের ১ থেকে ৯ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত রংপুর-১ আসন। নির্বাচনে জামায়াতের মহানগর কমিটির সহকারী সেক্রেটারি রায়হান সিরাজী প্রথমবার নির্বাচন করে ১ লাখ ৪৭ হাজার ২৪৫ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মোকাররম হোসেন সুজন পান ৬৯ হাজার ১৩১ ভোট।

গঙ্গাচড়ার বিএনপি নেতারা বলছেন, দ্বৈত নাগরিত্ব ইস্যু নিয়ে বিএনপি প্রার্থী মোকাররম হোসেনের রিটে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মঞ্জুম আলীর প্রার্থিতা বাতিল করেন আদালত। পরে মঞ্জুম আলী বিএনপির প্রার্থী ছাড়া অন্য যে কাউকে ভোট দেওয়ার নির্দেশনা দেন। এর ফলে জাতীয় পার্টি ও মঞ্জুম আলীর সমর্থকেরা জামায়াতের পক্ষে প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। এ কারণে রায়হান সিরাজী বড় ব্যবধানে জয় পান।

বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত রংপুর-২ আসনেও বড় ব্যবধানে জয় পান জামায়াতের নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম। চতুর্থবার নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি ১ লাখ ৩৫ হাজার ৫৫৬ ভোট পেয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মোহাম্মদ আলী সরকার পেয়েছেন ৮০ হাজার ৫৩৮ ভোট।

এ আসনে বিএনপির প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন বদরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি পরিতোষ চক্রবর্তী ও সাধারণ সম্পাদক আজিজুল হক। নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে তাঁরা দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করলেও নেতাদের দ্বন্দ্ব জামায়াতকে সুবিধা দিয়েছে মনে করেন তৃণমূল কর্মীরা।

অবশ্য বদরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি পরিতোষ চক্রবর্তী প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপির প্রার্থীর দুর্বলতা ছিল। তাঁর জয়ের ব্যাপারে অতি আত্মবিশ্বাস ছিল। এটাও হারার কারণ।

রংপুর-৩ (সদর ও সিটি) আসনে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামু মনোনয়ন পেলেও দলের একটি বড় অংশ চেয়েছিল নগর বিএনপির সদস্যসচিব মাহফুজ উন নবীকে। এমন অবস্থায় এই আসনে রিটা রহমান বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় দলের নেতা–কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে অস্বস্তি ছিল।

রংপুর-৪ আসনে বিএনপির ‘শক্তিশালী’ প্রার্থী ছিলেন জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এমদাদুল হক ভরসা। তিনি ৯ হাজার ৪০২ ভোটের ব্যবধানে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেনের কাছে হেরে যান। আখতার হোসেন পান ১ লাখ ৪৯ হাজার ৯৬৬ ভোট। অন্যদিকে এমদাদুল হক ভরসা পান ১ লাখ ৪০ হাজার ৫৬৪ ভোট।

রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর) আসনে জামায়াতের জেলা আমির ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান গোলাম রব্বানী ১ লাখ ৭৬ হাজার ৪১১ ভোট ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম রব্বানী পেয়েছেন ১ লাখ ১৫ হাজার ১১৬ ভোট।

স্থানীয় বিএনপি কর্মীরা বলছেন, এ আসনে জামায়াতের শক্তিশালী সাংগঠনিক অবস্থান ছিল। একই সঙ্গে বিএনপি প্রার্থী ভোটের মাঠে নতুন। বিএনপির দুর্বল প্রস্তুতি কারণে জামায়াতের জয় সহজ হয়েছে।

রংপুর-৬ আসনটি ক্ষমচাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শ্বশুরবাড়ি এলাকা। এর আগে এখানে সংসদ সদস্য ছিলেন সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। এবার এই আসনে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে জামায়াত ও বিএনপির মধ্যে।

জেলা বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম এবং জেলা জামায়াতের শুরা সদস্য নুরুল আমিনের মধ্যে রংপুর–৬ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। নির্বাচনে নুরুল আমিন পেয়েছেন ১ লাখ ২০ হাজার ১২৮ ভোট। বিপরীতে সাইফুল ইসলাম পেয়েছেন ১ লাখ ১৭ হাজার ৭০৩ ভোট। ফলাফলের হারে জয়ী জামায়াত প্রার্থীর সঙ্গে বিএনপির ব্যবধান মাত্র ২ হাজার ৪২৫ ভোট।

বিএনপি অবশ্য রংপুর-৩, রংপুর-৪ ও রংপুর-৬ আসনে প্রশাসনের বিরুদ্ধে ভোট গণনায় কারচুপি ও জালিয়াতির অভিযোগ করে। গতকাল রোববার এই তিন আসনের বিএনপির পরাজিত প্রার্থী ও তাঁদের হাজারো সমর্থক জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাযালয ঘেরাও করে ভোট পুনর্গণনার দাবি করেন।

জেলা বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘রংপুরের ছয়টি আসনে আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন চেয়েছিলাম, কিন্তু ১২ তারিখ আমাদের স্বপ্নের ওপর বিষাক্ত ছোবল মেরেছে রংপুরের রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ প্রশাসন। আজ প্রশাসনে রাজাকার, আলবদররা ঘাপটি মেরে আছে। রংপুরে প্রশাসনের কে কোন দল করে, সেই তালিকা আমাদের হাতে আছে। তারা রাতের অন্ধকারে জামায়াতের হাতে ছয়টি আসন তুলে দিয়েছে।’

সুশাসনের জন্য নাগরিকের জেলা কমিটির সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম প্রথম আলোকে বলেন, রংপুর বিভাগীয় শহর হলেও বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে রংপুরকে নেতৃত্ব দেওয়ার লোক নগন্য। আবার যাঁরা আছেন, তাঁরাও রংপুর থেকে ভোট করেননি। স্থানীয় নেতাদের ওপর ভোটারদের আস্থার সংকট ছিল। যে সংকট ঠাকুরগাঁও বা লালমনিরহাটে ছিল না।

রংপুরে জেলায় বিএনপির ভালো করার সুযোগ থাকলেও নেতাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও তৃণমূল কর্মীদের ম্যূল্যায়ন না করার কারণে সেই সুযোগ ঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়নি বলে মনে করেন সুজন সভাপতি।