হোলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলায় শহীদ পুলিশ কর্মকর্তা রবিউল করিমের সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার কাটিগ্রাম এলাকায়
হোলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলায় শহীদ পুলিশ কর্মকর্তা রবিউল করিমের সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার কাটিগ্রাম এলাকায়

মানিকগঞ্জে স্মরণসভা : ‘রবিউল নেই; কিন্তু তাঁর কীর্তি রয়ে গেছে’

ঢাকার গুলশানের হোলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় সন্ত্রাসীদের গুলিতে শহীদ পুলিশ কর্মকর্তা রবিউল করিমের দশম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়েছে। মানিকগঞ্জে আজ বুধবার বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় তাঁকে স্মরণ করা হয়েছে।

২০১৬ সালের ১ জুলাই হোলি আর্টিজান বেকারিতে দেশি ও বিদেশি নাগরিকদের জিম্মি করে সন্ত্রাসীরা। খবর পেয়ে তাঁদের উদ্ধারে ঘটনাস্থলে ছুটে যান ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তৎকালীন জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার (এসি) রবিউল করিম। এ সময় সন্ত্রাসীদের গুলি ও গ্রেনেডের আঘাতে নিহত হন তিনি।

রবিউল করিমের বাড়ি মানিকগঞ্জ সদরের কাটিগ্রাম এলাকায়। আজ বেলা ১১টার দিকে কাটিগ্রাম এলাকায় রবিউল করিম প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নজরুলবিদ্যা সিঁড়ি প্রাঙ্গণ থেকে একটি শোকযাত্রা বের হয়। এটি প্রায় এক কিলোমিটার সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে কাটিগ্রাম কবরস্থানের সামনে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে রবিউলের সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়।

এরপর দুপুর ১২টার দিকে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু-কিশোরদের জন্য রবিউলের গড়া বিকনিং লাইট অর্গানাইজেশন অব ম্যানকাইন্ড অ্যান্ড সোসাইটি (ব্লুমস) বিশেষায়িত বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। স্মরণসভাটি ব্লুমসের প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম সঞ্চালনা করেন।

স্মরণসভায় ব্লুমস পরিচালনা কমিটির সভাপতি জি আর শওকত আলীর সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবদুল্লাহ আল মাসুম, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) জেলা কমিটির সভাপতি বদরুল আলম চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান, মানিকগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বিশ্বাস এবং ব্লুমস পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব ও রবিউলের ছোট ভাই শামসুজ্জামান শামস প্রমুখ।

রবিউল করিমের সহকর্মী ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মাসুম বলেন, ‘রবিউলের সঙ্গে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ও চাকরির সময়ের অনেক স্মৃতি রয়েছে। রবিউল অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। তিনি একজন শক্ত মনের মানুষ ছিলেন। অনেকের অর্থসম্পদ থাকলেও বিশেষায়িত শিশুদের জন্য এ ধরনের উদ্যোগের (ব্লুমস প্রতিষ্ঠা) চিন্তাও করেন না। নিজের স্বার্থ নিয়ে চিন্তা না করে রবিউল অবহেলিত শিশুদের জন্য এ রকম প্রতিষ্ঠান গড়েছেন। সত্যিকারের দেশপ্রেমী ছিলেন তিনি।’

৫ আগস্টের পর ঢাকা মিন্টো রোডে ডিবির প্রধান কার্যালয়ে প্রধান ফটকে রবিউল করিমের নামফলক খুলে ফেলার বিষয়ে আবদুল্লাহ আল মাসুম বলেন, ‘রবিউলের নামফলক কেউ না কেউ খুলেছে। তবে এটা পুলিশ খোলেনি। এটা দুঃখজনক। এ বিষয়ে আমরা যাঁরা একই ব্যাচের পুলিশ কর্মকর্তা রয়েছি, সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, পুলিশ কমিশনারের কাছে লিখিত আবেদন করব, যাতে নামফলকটি পুনঃস্থাপন করা যায়। আজ রবিউল নেই; কিন্তু তাঁর কীর্তি রয়ে গেছে।’

ড্যাবের জেলা কমিটির সভাপতি বদরুল আলম চৌধুরী বলেন, বিশেষায়িত শিশুদের জন্য প্রতিষ্ঠান গড়া খুব দুরূহ। রবিউল করিম তা করে গেছেন। রবিউল করিম যে কর্ম করে গেছেন, তা তাঁকে যুগ যুগ ধরে বাঁচিয়ে রাখবে। বিমানমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতার নির্দেশে ড্যাবের উদ্যোগে বিদ্যালয়টি শিশু-কিশোর ও অভিভাবকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবে।

শামসুজ্জামান শামস বলেন, ‘একজন প্রকৃত দেশপ্রেমী হিসেবে দায়িত্ববোধ এবং মানবিকতায় উদ্বুদ্ধ  রবিউল জিম্মিদের উদ্ধার করতে গিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। হোলি আর্টিজানে পুলিশ সদস্যদের এ ধরনের বীরোচিত আত্মোৎসর্গের মধ্য দিয়ে সে সময় দেশ–বিদেশে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অবস্থান এবং পদক্ষেপের ইতিবাচক ধারণা জোরালো হয়েছিল। এ ঘটনায় সে সময় সারা বিশ্ব শহীদদের প্রতি সমবেদনা যেমন দেখিয়েছে, তেমনি পুলিশ বাহিনীর প্রশংসা করেছে; কিন্তু আমরা দেখেছি, ডিবির মূল ফটক থেকে রবিউলের নাম মুছে ফেলা হয়েছে। গুলশান থানার সামনে তাঁর ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় আমরা গভীরভাবে মর্মাহত। রবিউল ভাইকে শ্রদ্ধা জানাতে হলে, ভালোবাসতে হলে তাঁর কাজগুলোকে ভালোবাসতে হবে। তাঁর স্মৃতিচিহ্নগুলোকে রক্ষা করতে হবে। মানুষের কল্যাণে তাঁর অসম্পূর্ণ কাজগুলোকে সম্পন্ন করতে হবে।’

হোলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলায় শহীদ পুলিশ কর্মকর্তা রবিউল করিমের স্মরণে শোকযাত্রা বের করা হয়। বুধবার বেলা ১১টার দিকে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার কাটিগ্রাম এলাকায়

ব্লুমস সূত্রে জানা গেছে, সমাজের পিছিয়ে পড়া বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু-কিশোরদের জন্য ২০১১ সালে বাড়ির অদূরে বাসাই গ্রামে মায়ের দান করা জমিতে গড়ে তোলেন ব্লুমস। ২০১২ সালে ১২টি বিশেষায়িত শিশু-কিশোরকে নিয়ে বিদ্যালয়টির কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ৪৭ জন শিশু-কিশোর পড়াশোনা ও চিকিৎসাসেবা নিচ্ছে। বিশেষায়িত বিদ্যালয়টিতে সপ্তাহে পাঁচ দিন পাঠদান করানো হয়। শিশু-কিশোরদের ফিজিওথেরাপি ও স্পিচ থেরাপি দেওয়ার পাশাপাশি ইশারা ভাষা শেখানো হয়। আছে খেলাধুলার ব্যবস্থাও।

এদিকে বিকেল চারটার দিকে মানিকগঞ্জের পুলিশ লাইনসে রবিউল করিম ফটকের পাশে নির্মিত রবিউল করিমের ম্যুরালে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান তাঁর পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা।