কক্সবাজারে পুড়ে যাওয়া টুপটুপ রিসোর্ট
কক্সবাজারে পুড়ে যাওয়া টুপটুপ রিসোর্ট

কক্সবাজারে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় জামিনযোগ্য ধারায় মামলা, ওসিকে আদালতে তলব

কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ারটেক সৈকতে কাঠের তৈরি টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে জামিনযোগ্য ধারায়। এ ঘটনায় উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমানকে আদালতে তলব করেছেন বিচারক। মামলায় জামিন অযোগ্য ধারা সংযোজন না করে জামিনযোগ্য ধারায় মামলা রেকর্ড করাকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেছেন আদালত।

১৭ অক্টোবর সকালে রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। এ ঘটনায় ১০ জনের পুড়ে যাওয়া মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার ৯ দিন পরও রিসোর্টের মালিক মো. তানভীর সুলতান মিয়াসহ তিন আসামি গ্রেপ্তার হননি। তবে রিসোর্টের সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

আজ সোমবার কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আসাদ উদ্দিন মো. আসিফ এক আদেশে ওসি আতিকুর রহমানকে ২৯ অক্টোবর আদালতে সশরীর হাজির হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেন। আদেশে বলা হয়, দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ২১৮ ধারা অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা এবং বিভাগীয় শাস্তির নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা ব্যাখ্যা করতে হবে।

আদালতের আদেশের বিষয়টি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শাহাজাহান এলাহী নূরী। তিনি বলেন, নোটিশের অনুলিপি ওসি আতিকুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোয় পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি আতিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি আদালতের নোটিশ পাননি। নোটিশ পেলে যথাসময়ে আদালতে হাজির হয়ে অভিযোগের ব্যাখ্যা দেবেন। টুপটুপ রিসোর্টে আগুনে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় তিনিও মর্মাহত বলে জানান। ওসি বলেন, আগুন লাগার ব্যস্ততার মধ্যে মামলার এজাহারে দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারা বাদ পড়েছিল। পরদিন আদালতে ওই ধারা সংযোজনের আবেদন করা হয়।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

আদালতের আদেশে বলা হয়, ১৭ অক্টোবর টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় দণ্ডবিধির ৩০৪-ক, ৩৩৮ ও ৩৪ ধারা উল্লেখ করা হয়। মামলা করার এক দিন পর, ১৯ অক্টোবর, তদন্ত কর্মকর্তা দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারা সংযোজনের আবেদন করেন।

আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, মামলার রেকর্ডিং কর্মকর্তা হিসেবে ওসি আতিকুর রহমান ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ এজাহার রেকর্ডের সময় ৩০৪ ধারা সংযোজন করেননি। ১০ পর্যটকের মৃত্যুর মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনায় জামিন অযোগ্য ৩০৪ ধারা যুক্ত না করে জামিনযোগ্য ৩০৪-ক ধারায় মামলা রেকর্ড করে তিনি গুরুতর অপরাধ করেছেন বলে মনে করেন আদালত।

আদেশে আরও বলা হয়, টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা ও জরুরি বহির্গমনপথ (ফায়ার এক্সিট) ছিল না। ফলে আগুনে দগ্ধ পর্যটকেরা রিসোর্টের ভেতরে আটকা পড়েন এবং বের হতে না পেরে ১০ জনের মৃত্যু হয়।

কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত ঘিরে এভাবে গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিত, অবৈধ রিসোর্টসহ বিভিন্ন স্থাপনা। মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাটুয়ারটেক এলাকায়

আদালতের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে রিসোর্টের মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা ছাড়াই রিসোর্টটি পরিচালনা করে আসছিলেন। অগ্নিকাণ্ড ঘটলে অতিথিরা কক্ষ থেকে বের হতে না পেরে প্রাণ হারাতে পারেন, এমন ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তাঁরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেননি বলে আদালত উল্লেখ করেন।

আদেশে বলা হয়, এ ঘটনায় দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারায় মামলা রেকর্ড না করে জামিনযোগ্য ৩০৪-ক ধারায় মামলা নেওয়ার মাধ্যমে আসামিদের উপযুক্ত শাস্তি থেকে রক্ষা করার অসৎ উদ্দেশ্য ছিল বলে আদালত মনে করেন। দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। অন্যদিকে ৩০৪-ক ধারায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

মামলার বিবরণ

পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, ১৭ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৮টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে রিসোর্টে আগুন লাগার খবর পায় পুলিশ। সকাল সোয়া নয়টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ দেখতে পায়, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নেভানোর চেষ্টা করছেন। বেলা আড়াইটার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে রিসোর্ট থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ইনানী পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) রিমন ঘোষ মরদেহগুলোর সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন। আগুনে পুড়ে যাওয়ায় মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরে ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের জন্য মরদেহগুলো কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

এ ঘটনায় ১৭ অক্টোবর রাত ১১টার দিকে উখিয়া থানার উপপরিদর্শক আশীষ সূত্রধর অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে মামলা করেন। এতে ৪ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা ১৯ জনকে আসামি করা হয়। সব মিলিয়ে আসামি ২৩ জন।

মামলার এজাহারে নাম থাকা চার আসামি হলেন রিসোর্টের মালিক ও চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর পূর্ব গোমদণ্ডীর বাসিন্দা মো. তানভীর সুলতান মিয়া (৩৮), প্রধান ব্যবস্থাপক বরিশালের সাঈদ আহমদ (৩২), ব্যবস্থাপক উখিয়ার জালিয়াপালং এলাকার মোহাম্মদ সাইদ (৩০) এবং সহকারী ব্যবস্থাপক চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার চুনতি এলাকার জাহিদ হোসেন সুমন (২৯)। রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁর কর্মরত ১৯ জনকে মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।

তবে রিসোর্টের আরেক মালিক নেওয়াজ মোরশেদের নাম এজাহারে নেই। ভুলক্রমে বাদ পড়া তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আদালতে আবেদন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ওসি আতিকুর রহমান।

মামলার চার নম্বর আসামি জাহিদ হোসেনকে ১৮ অক্টোবর বিকেলে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায় পুলিশ। তাঁর সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। আদালত সূত্র জানায়, আজ বিকেল পর্যন্ত ওই আবেদনের শুনানি হয়নি। আগামীকাল মঙ্গলবার শুনানি হতে পারে। জাহিদ হোসেনকে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।