
কক্সবাজারে সৈকতে বসে ইফতার দিন দিনই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সৈকতের পাশে গড়ে ওঠা বিভিন্ন রেস্তোরাঁও বেলাভূমিতে টেবিল পেতে আয়োজন করছে ইফতারের। পর্যটকেরা তো বটেই, স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই শান্ত-স্নিগ্ধ এমন পরিবেশে ইফতার সারতে ছুটে আসছেন। পবিত্র রমজান মাসে পর্যটকদের সৈকতে বসে ইফতারের সুযোগ করে দিতে ছাড় দিচ্ছে হোটেল–মোটেলগুলো।
সৈকতের বেলাভূমিতে পাটি বিছিয়ে বসে আছেন ১০ থেকে ১৫ জন। সামনে সাজানো শরবত, ফলমূল আর নানা পদের ইফতারসামগ্রী। নীরব সৈকতে ঢেউয়ের মৃদু গর্জনের ধ্বনি। দিগন্তরেখায় অস্তগামী লাল সূর্যের আভা ছড়িয়ে পড়েছে সমুদ্রের জলে। দুই সারিতে বসে থাকা মানুষ সেদিকে তাকিয়ে গল্পে মশগুল। সূর্য ডুবলে এই অবারিত প্রকৃতিতেই ইফতার শুরু করবেন তাঁরা।
কক্সবাজার সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে আজকাল এমন ইফতার আয়োজনের দৃশ্য চোখে পড়ে। সৈকতের পাশে গড়ে ওঠা বিভিন্ন রেস্তোরাঁও বেলাভূমিতে টেবিল পেতে আয়োজন করছে ইফতারের। পবিত্র রমজান মাসে সৈকতে বসে ইফতার দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। পর্যটকেরা তো বটেই, স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই শান্ত-স্নিগ্ধ এমন পরিবেশে ইফতার সারতে ছুটে আসছেন। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আসছেন কেউ আবার কেউ আসছেন বন্ধুদের দিয়ে। অনেকে আবার কর্মক্ষেত্রের সহকর্মীদের সঙ্গেও ইফতার করতে সৈকতকে বেছে নিচ্ছেন।
ইফতারের এমন দৃশ্য প্রচার করে পর্যটক টানতে চাইছেন হোটেল-মোটেলের মালিকেরা। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অখণ্ড সৈকতে বসে ইফতারের সুযোগ নিতে পর্যটকদের জন্য নানা ধরনের ছাড়ের ঘোষণাও দেওয়া হচ্ছে।
গতকাল বুধবার বিকেল চারটায় সৈকতের কবিতা চত্বর পয়েন্টে গিয়ে দেখা গেল বালিয়াড়িতে বসে ইফতারসামগ্রী নিয়ে বসেছে সাতটি দল। একেকটি দলে ১০-১৫ জন নারী-পুরুষ। বাড়ি কিংবা দোকান থেকে আনা তরমুজ, ছোলা, খেজুর, পেঁয়াজু, জিলাপি, মুড়ি, শসা, টমেটো, গাজর, ফলমূল কেটেকুটে ইফতারের আয়োজন করছিলেন তাঁরা।
কক্সবাজার হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে কক্সবাজারের পর্যটনকেন্দ্রগুলো কোলাহলমুক্ত। নেই কোনো ভিড় ও যান্ত্রিক কোলাহল। হোটেলমালিকেরা দিচ্ছেন ৫০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত বিশাল ছাড়। যাঁরা কিছুটা মানসিক প্রশান্তি খুঁজছেন, তাঁদের জন্য এই সময় সেরা। রোজার মাসে পর্যটকসহ স্থানীয়দের সৈকতমুখী করতে তারকা মানের বেশ কিছু হোটেল-রিসোর্ট বিশেষ ইফতারির প্যাকেজ ঘোষণা করে, তাতে বেশ সাড়াও মিলছে।
রোজার মাসে কক্সবাজার শহরের তিন শতাধিক রেস্তোরাঁ বন্ধ থাকে। খাওয়াদাওয়া নিয়ে পর্যটকদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। ভবিষ্যতে রেস্তোরাঁ বন্ধ না রেখে মানসম্পন্ন সাহ্রি ও ইফতারির প্যাকেজ চালু, ইফতারি ও সাহ্রির ব্যুফেতে অংশ নেওয়া পর্যটকদের জন্য কক্সবাজার-ঢাকা এয়ার টিকিটসহ তারকা মানের হোটেলে বিনা মূল্যে রাতযাপন, বিশেষ পুরস্কার ও ডিজিটাল মার্কেটিং করার উদ্যোগ নেওয়া দরকার বলে মনে করেন কক্সবাজার হোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার।
আবুল কাশেম সিকদার বলেন, রমজান মাসে কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবসা সচল রাখা চ্যালেঞ্জ হলেও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে পর্যটক আকর্ষণের বেশ কিছু কার্যকর উপায় আছে। এর মধ্যে বিশেষ ছাড়ে হোটেল থাকার সুযোগ, কিছু হোটেল আর্থিক সংকটে থাকা পর্যটকদের বিনা মূল্যে রাতযাপনের ব্যবস্থা, সৈকতে বসে ইফতারের সুযোগ চালু করা যেতে পারে। এসব সুবিধা চালু হলে পবিত্র রমজানেও পর্যটকেরা কক্সবাজার আসবেন।
সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে ইফতার
ধু ধু বালিয়াড়ি, নীল জলরাশির অবিরাম গর্জন, মাথার ওপর গোধূলিরাঙা আকাশ—এমন মনোমুগ্ধকর পরিবেশে পরিবার কিংবা প্রিয়জনদের নিয়ে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে ইফতার করার দৃশ্য কেবল কক্সবাজার সৈকতে সম্ভব বলে মন্তব্য করেন কয়েকজন পর্যটক।
গতকাল বুধবার বিকেল চারটায় সৈকতের কবিতা চত্বর পয়েন্টে গিয়ে দেখা গেল, বালিয়াড়িতে বসে ইফতারসামগ্রী নিয়ে বসেছে সাতটি দল। একেটি দলে ১০-১৫ জন নারী-পুরুষ। বাড়ি কিংবা দোকান থেকে আনা তরমুজ, ছোলা, খেজুর, পেঁয়াজু, জিলাপি, মুড়ি, শসা, টমেটো, গাজর, ফলমূল কেটেকুটে ইফতারের আয়োজন করছিলেন তাঁরা।
একটি দলে ১২ জন নারী-পুরুষকে দেখা গেল। ওই দলের একজন শহরের বাহারছড়ার বাসিন্দা সাকিবুল হাসান। তিনি বলেন, ‘ঘরে সব সময় ইফতার করা হয়। মাঝেমধ্যে উন্মুক্ত সৈকতে গোল করে বসে গল্প–আড্ডা দিতে দিতে ইফতার করতে ইচ্ছা হয়। তাই চলে এলাম।’
আরেকটি দলের সঙ্গে আসা তরুণী ইসরাত জাহান বলেন, ‘গত রোজার সময় বন্ধুদের সঙ্গে একবার সৈকতে ইফতার করেছিলাম। এবার এসেছি পরিবারের সঙ্গে। সমুদ্রের ঢেউ আর সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে ইফতার করতে অন্য রকম শান্তি মেলে।’
রমজান মাসে কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবসা সচল রাখা চ্যালেঞ্জ হলেও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে পর্যটক আকর্ষণের বেশ কিছু কার্যকর উপায় আছে। এর মধ্যে বিশেষ ছাড়ে হোটেল থাকার সুযোগ, কিছু হোটেল আর্থিক সংকটে থাকা পর্যটকদের বিনা মূল্যে রাতযাপনের ব্যবস্থা, সৈকতে বসে ইফতারের সুযোগ চালু করা যেতে পারে। এসব সুবিধা চালু হলে পবিত্র রমজানেও পর্যটকেরা কক্সবাজার আসবেন।আবুল কাশেম সিকদার, সভাপতি, কক্সবাজার হোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতি
সৈকতের লাবণি, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টেও এমন ইফতারের আয়োজন দেখা গেল। বাদ যাচ্ছে না দৃষ্টিনন্দন কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের হিমছড়ি, সোনারপাড়া, ইনানী, পাটোয়ারটেক ও টেকনাফ সৈকতও। প্রতিদিন অন্তত ৪০-৫০টি দল বালিয়াড়িতে ইফতার করতে ছুটে আসছেন। সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র-শনিবার ইফতার আয়োজন বেড়ে দুই গুণ। পর্যটক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় লোকজন, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্যরাও সৈকতমুখী হচ্ছেন।
মেরিন ড্রাইভের প্যাঁচারদ্বীপ সৈকতে পরিবেশবান্ধব ইকোট্যুরিজমের মারমেইড বিচ রিসোর্ট সৈকতে আয়োজন করেছে ব্যুফে ইফতারির। এখানে স্থানীয়দের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকেরাও আসছেন।
রিসোর্টের ব্যবস্থাপক ইয়াসির আরাফাত রিশাদ বলেন, ২৫ প্রকারের ব্যুফে ইফতারিতে দেশ-বিদেশের পর্যটক ছাড়াও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বিমা, সংগঠন-ক্লাবের সদস্যরাও অংশ নিচ্ছেন।
পরিবারের চার সদস্য নিয়ে গত সোমবার ঢাকা থেকে কক্সবাজার বেড়াতে আসেন কেফায়েত উল্লাহ। অর্ধেক ছাড়ে ওঠেন কলাতলীর একটি তারকা হোটেলে। কেফায়েত বলেন, কম ভাড়ার হোটেলে থাকার সুযোগ, নিরিবিলি পরিবেশে ঘোরাফেরা এবং প্রতিদিন সৈকতে বসে ইফতার—নতুন অভিজ্ঞতার সঞ্চার হচ্ছে। পাহাড় আর সাগরের মিলনস্থলে বসে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে ইফতার সেরে নেওয়ার সুযোগ সম্ভবত দেশের আর কোথাও নেই।