
রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক জাওয়াদুল হককে হেনস্তা ও কাগজে সই করে কার্যালয় থেকে বের করে দেওয়ার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছেন রাজশাহীর চিকিৎসকেরা। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও পৃথক মানববন্ধন করেছেন।
আজ বুধবার বেলা ১টার দিকে নগরের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসংলগ্ন এলাকায় চিকিৎসকেরা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী কার্যালয়ের সামনে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব কর্মসূচি পালন করেন।
মানববন্ধনে চিকিৎসকেরা উপাচার্যকে হেনস্তার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। একই সঙ্গে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তাঁরা।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি এস এম তপু বলেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্মকর্তার নিরাপত্তা যদি এভাবে বিঘ্নিত হয়, তাহলে চিকিৎসকেরা কতটা নিরাপদে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন, সেই প্রশ্ন সামনে আসে। ১ হাজার ৩০০ শয্যার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার রোগী ভর্তি হন। পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও সহায়ক জনবল না থাকলেও চিকিৎসকেরা অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাচ্ছেন।
কঠোর কর্মসূচি হুঁশিয়ারি দিয়ে এস এম তপু আরও বলেন, ‘আমরা চাই না, কর্মবিরতির কারণে কোনো রোগী সেবা থেকে বঞ্চিত হোক। কিন্তু ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এ ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়া না হলে কঠোর কর্মসূচি নিতে বাধ্য হব।’
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও এনডিএফের কলেজ শাখার সভাপতি শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের চিকিৎসক সমাজকে আহ্বান জানাই, এ ধরনের মব কালচারের বিরুদ্ধে সবাইকে দাঁড়াতে হবে। চিকিৎসকেরা রোগীর চিকিৎসা ও অপারেশন নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চান। এভাবে বারবার প্রতিবাদ কর্মসূচিতে রাস্তায় নামতে চান না।’ প্রশাসনকে এ ধরনের ঘটনা বন্ধে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও এনডিএফের কলেজ শাখার দপ্তর সম্পাদক মোহাম্মদ মশিউর রহমান বলেন, একজন সম্মানিত নাগরিককে যদি রাষ্ট্র নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেটা খুবই দুঃখজনক। তিনি অধ্যাপক জাওয়াদুল হকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান। একই সঙ্গে ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এ ছাড়া ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের নারীবিষয়ক সম্পাদক তাসনিয়া আক্তার ও ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক ইফতিয়ার হোসেন বক্তব্য দেন।
অন্যদিকে প্রায় একই সময়ে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও মানববন্ধন করেন। তাঁরা উপাচার্যকে হেনস্তার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ জাকির হোসেন খোন্দকার, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মো. শাহ আলম, কলেজ পরিদর্শক অধ্যাপক শাহ মো. বদরুদ্দোজা, পরিচালক নজিবুর রহমান, পরিচালক নাজিমউদ্দীন আহমেদ, উপ-রেজিস্ট্রার মোয়াফখারুল ইসলাম, উপ-পরিচালক আশরাফুল হক, উপ-কলেজ পরিদর্শক মনির-উল-ইসলাম, সহকারী রেজিস্ট্রার সিরাজুল ইসলাম, সহকারী পরিচালক খাইরুল আলম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
একজন গ্রেপ্তার
গতকাল মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রামেবির অস্থায়ী কার্যালয়ে উপাচার্যের কক্ষে ঢুকে তাঁকে একটি কাগজে সই করতে বাধ্য করার অভিযোগ ওঠে। উপাচার্যের ভাষ্য, তাঁকে কাগজটি পড়তে দেওয়া হয়নি। সই না করলে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হতে পারেন—এমন আশঙ্কা থেকে তিনি কাগজটিতে সই করেন। তাঁর ধারণা, সেটি ছিল পদত্যাগপত্র।
এ ঘটনায় গতকাল রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারী ও সেকশন অফিসার (অর্থ) মো. নাজমুল হোসাইন বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে। সরকারি কাজে বাধা, সরঞ্জাম চুরি, ভাঙচুরসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ঘটনায় আবদুস সালাম নামেরএকজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র ও উপপুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মো. গাজিউর রহমান বলেন, পুলিশ ইতিমধ্যে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে। ঘটনাস্থলের ভিডিও ও ছবি বিশ্লেষণ করে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হচ্ছে। তদন্তের ভিত্তিতে অন্য ব্যক্তিদেরও গ্রেপ্তার করা হবে।
উপাচার্যের কক্ষে তালা
এদিকে আজ দ্বিতীয় দিনের মতো উপাচার্যের কক্ষে তালা ঝুলছে। আজ বেলা আড়াইটার দিকেও তালা দেখা গেছে। উপাচার্য দপ্তরে না এলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসেছেন। দাপ্তরিক কাজও চলমান আছে। বিদ্যুতের লাইন ঠিক করা হলেও ইন্টারনেট–সেবা এখনো অকার্যকর আছে বলে জানিয়েছেন উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারী ও সেকশন অফিসার (অর্থ) নাজমুল হোসাইন।