সাতক্ষীরা সদর উপজেলার শাল্যে আদর্শ দাখিল মাদ্রাসার অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির ১৬ জন ছাত্রীর বাল্যবিবাহ হয়েছে। গত দেড় বছরের মধ্যে এসব বিয়ে হয়েছে বলে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। এরই মধ্যে তিনজন ছাত্রীর বিয়ে ভেঙে গেছে। তারা এখন বাবার বাড়ি থেকে আবার মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে।
আজ বৃহস্পতিবার ১৬ জন ছাত্রীর অভিভাবককে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে ডেকে আনা হয়। তাঁদের মধ্যে ১৩ জন ছাত্রীও উপস্থিত ছিল।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ইউএনওর কার্যালয়ের সভাকক্ষে গিয়ে দেখা যায়, ছাত্রী ও অভিভাবকেরা বসে আছেন। সাতক্ষীরা মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের প্রকল্প কর্মকর্তা ফাতেমা জোহরা তাঁদের হাজিরা নিচ্ছিলেন। একই সঙ্গে ছাত্রীদের জন্মনিবন্ধন, অভিভাবকদের জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি ও বিয়ের কাগজপত্র আছে কি না, তা দেখা হচ্ছিল। পরে ইউএনও অর্ণব দত্ত সভাকক্ষে এসে অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেন।
বৈঠকে এক অভিভাবক জানান, তাঁর মেয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় একটি ছেলের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। প্রায় এক মাস আগে পরিবারের অজান্তে ওই ছেলেকে বিয়ে করে। পরে বিষয়টি জানতে পেরে তিনি বিয়ে মেনে নেন। ভ্যান চালিয়ে সংসার চালানো ওই অভিভাবক বলেন, কাজের কারণে দিনের বেশির ভাগ সময় বাইরে থাকতে হয়। তাই মেয়ের ওপর সব সময় নজর রাখা সম্ভব হয়নি।
আরেক অভিভাবক জানান, মুঠোফোনের মাধ্যমে তাঁর মেয়ে পঞ্চগড়ের এক ছেলের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে গোপনে বাড়ি থেকে চলে গিয়ে ওই ছেলেকে বিয়ে করে। পরে তিনি মেয়েকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনেন। এরপর ছেলেটিকে ভালো মনে হওয়ায় মেয়েকে আবার তাঁর সঙ্গে বিয়ে দেন। তবে বিয়েটি নিবন্ধিত হয়নি। স্থানীয় এক হুজুর বিয়ে পড়িয়েছেন বলে ওই অভিভাবক জানান। মেয়েটি এখন শ্বশুরবাড়ি আছে।
এক অভিভাবক বলেন, তাঁর মেয়ের বয়স ১৫ বছর। মাদ্রাসায় পড়ার সময় স্থানীয় কিছু বখাটে তরুণের উৎপাত নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন। মেয়ের নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনি বিয়ে দিয়েছেন। ইউএনও তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, বিষয়টি মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা প্রশাসনকে জানিয়েছিলেন কি না। ওই অভিভাবক জানান, কাউকে জানাননি।
কোনো ছাত্রী বিয়ের আগে কোনো ঝুঁকিতে থাকলে আইনি সহায়তা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন ছাত্রী ভর্তি থাকা অবস্থায় তাঁর বাল্যবিবাহ ঠেকানোর দায়িত্ব থেকে প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিজেকে দূরে রাখতে পারেন না।অর্ণব দত্ত, ইউএনও, সাতক্ষীরা সদর উপজেলা
ইউএনও অর্ণব দত্ত বলেন, কোনো ছাত্রী বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে থাকলে বিষয়টি আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানকে জানতে হবে। এরপর স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও উপজেলা প্রশাসনকে জানাতে হবে। তিনি বলেন, মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট নিয়মিত তাঁর কার্যালয়ে এলেও কোনো ছাত্রীকে বাল্যবিবাহ থেকে রক্ষার বিষয়ে আগে তাঁকে জানানো হয়নি।
অর্ণব দত্ত বলেন, কোনো ছাত্রী বিয়ের আগে কোনো ঝুঁকিতে থাকলে আইনি সহায়তা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন ছাত্রী ভর্তি থাকা অবস্থায় তাঁর বাল্যবিবাহ ঠেকানোর দায়িত্ব থেকে প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিজেকে দূরে রাখতে পারেন না।
বৈঠক শেষে অভিভাবকদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নেওয়া হয়, মেয়েদের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে শ্বশুরবাড়িতে পাঠানো যাবে না এবং তাঁদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হবে। ইউএনও সতর্ক করে বলেন, কেউ এ নির্দেশ অমান্য করে মেয়েকে শ্বশুরবাড়িতে পাঠালে নিয়মিত মামলা করা হবে। ছাত্রীদের জন্মনিবন্ধন ও অভিভাবকদের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য প্রশাসনের নথিতে রাখা হয়।
সাতক্ষীরার বাল্যবিবাহের পরিস্থিতি নিয়ে ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর প্রথম আলোয় ‘সরেজমিন সাতক্ষীরা: দশম শ্রেণিতে ওঠার আগেই অর্ধেক ছাত্রীর বাল্যবিবাহ, কয়েকটি কারণ বলছে পরিবার’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সাতক্ষীরায় ছেলেদেরও বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটে।
সাতক্ষীরার বাল্যবিবাহের পরিস্থিতি নিয়ে ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর প্রথম আলোয় ‘সরেজমিন সাতক্ষীরা: দশম শ্রেণিতে ওঠার আগেই অর্ধেক ছাত্রীর বাল্যবিবাহ, কয়েকটি কারণ বলছে পরিবার’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সাতক্ষীরায় ছেলেদেরও বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটে। ছেলেদের বাল্যবিবাহের সুর্নিদিষ্ট হিসাব পাওয়া না গেলেও বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২৩-এর প্রতিবেদন থেকে পাওয়া যায়, শহরাঞ্চলে প্রতি হাজারে ৭৩ জন মেয়ে ও ১৪ জন ছেলে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সের মধ্যে বিয়ে করছেন।
বৈঠকে শাল্যে আদর্শ দাখিল মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ১৬ জনই তাঁর মাদ্রাসার ছাত্রী। গত দেড় বছরের মধ্যে বিয়েগুলো হয়েছে। এর মধ্যে দুই থেকে তিনজন এখন পড়াশোনা বন্ধ রেখেছে। কোনো ছাত্রী কয়েক দিন অনুপস্থিত থাকলে শিক্ষকেরা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপরও না এলে তিনি শিক্ষকদের নিয়ে ওই ছাত্রীর বাড়িতে যান।
বাল্যবিবাহ রোধে কার্যক্রম সম্পর্কে মো. নুরুল ইসলাম বলেন, আগে জানতে পারলে বাল্যবিবাহ ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়। মাদ্রাসায় সচেতনতামূলক সভা ও ‘বাল্যবিবাহকে না বলুন’ প্রচারণা চালানো হয়েছে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে একটি কমিটিও রয়েছে। অনেক সময় অভিভাবকেরা মেয়ের বিয়ের বিষয়টি গোপন রাখেন। কখনো এক-দুই মাস পর, আবার কখনো ছয় মাস পর বিয়ের খবর পাওয়া যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিয়ে হয়েছে কি না জানার আগেই বিবাহবিচ্ছেদের খবরও তাঁরা পেয়েছেন।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপস্থিত অভিভাবকদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছে, মেয়েদের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে বিয়ে দেওয়া যাবে না এবং পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হবে। বিষয়টি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যালয়কেও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।নাজমুন নাহার, সাতক্ষীরা জেলা মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক
সাতক্ষীরা জেলা মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাজমুন নাহার বলেন, অভিভাবকেরা বিয়ের কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মৌলভি ডেকে গোপনে এসব বিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপস্থিত অভিভাবকদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছে, মেয়েদের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে বিয়ে দেওয়া যাবে না এবং পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হবে। বিষয়টি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যালয়কেও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
জেলা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির সদস্য শাকিবুর রহমান (বাবলা) বলেন, ৭ সেপ্টেম্বর তিনি শাল্যে আদর্শ দাখিল মাদ্রাসায় গিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেন। তখন ১৬ জন ছাত্রীর বাল্যবিবাহের বিষয়টি জানতে পারেন। পরে তথ্য সংগ্রহ করে ৯ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন।
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বাল্যবিবাহের প্রবণতা নিয়ে ২০২৪ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত হয় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘স্মল এরিয়া এস্টিমেশন’ প্রতিবেদন। ওই প্রতিবেদন অনুসারে, জেলাগুলোয় বাল্যবিবাহের দিক দিয়ে সাতক্ষীরার অবস্থান অষ্টম। এ জেলায় ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বাল্যবিবাহের হার ৬২–এর বেশি। প্রতিবেদন অনুসারে, ৬৫ শতাংশ বাল্যবিবাহের হার নিয়ে শীর্ষে রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ। দ্বিতীয় স্থানে জয়পুরহাট, তৃতীয় বগুড়া, চতুর্থ নাটোর, পঞ্চম পাবনা, ষষ্ঠ মেহেরপুর ও রাজশাহী এবং সপ্তম স্থানে নওগাঁ।
বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ (বিডিএইচএস) ২০২২ প্রতিবেদন অনুসারে, দেশে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বাল্যবিবাহের হার ৫০ শতাংশ।
বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ অনুসারে, ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়ে এবং ২১ বছরের কম বয়সী ছেলের বিয়ে হলে তা বাল্যবিবাহ। আইনে বাল্যবিবাহ করা, সম্পাদন ও পরিচালনার জন্য সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। ১৯ ধারায় বিশেষ বিধান অনুসারে, বিশেষ প্রেক্ষাপটে অপ্রাপ্তবয়স্কের সর্বোত্তম স্বার্থে আদালতের নির্দেশে এবং মা-বাবা কিংবা অভিভাবকের সম্মতিতে বাল্যবিবাহ হলে অপরাধ গণ্য হবে না।