
আজ ৬ জানুয়ারি। দিনাজপুর মহারাজা স্কুল মাইন বিস্ফোরণ ট্র্যাজেডি দিবস। ১৯৭২ সালের এই দিনে দিনাজপুর শহরের মহারাজা গিরিজানাথ স্কুল ভবনে মাইন বিস্ফোরণের ঘটনায় বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ সাড়ে পাঁচ শতাধিক মানুষ শহীদ হন। মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের মাত্র ২১ দিনের মাথায় ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাটিকে দেশের ইতিহাসে মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম বড় প্রাণহানির ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
দিবসটি উপলক্ষে আজ মঙ্গলবার সকালে শহরের চেহেলগাজী এলাকায় শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গণকবর ও মহারাজা স্কুল–সংলগ্ন স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজনের কথা আছে।
দিনাজপুর জেলা শত্রুমুক্ত হয় ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর রাতে। পরদিন ১৪ ডিসেম্বর বিজয়ের আনন্দে ভারতীয় সীমান্তসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ শহরে প্রবেশ করতে থাকে। ওই সময় মুক্তিযোদ্ধাদের অস্থায়ী ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল মহারাজা গিরিজানাথ স্কুল।
প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার করা অস্ত্রশস্ত্র ট্রাকে করে এনে স্কুল ভবনের বাংকারে রাখা হতো। এসব অস্ত্রের মধ্যে ছিল অ্যান্টি ট্যাংক মাইন, অ্যান্টি পারসোনাল মাইন, জাম্পিং মাইন, মর্টার শেল, গ্রেনেড, গোলাবারুদ, বোমা ও বিভিন্ন ধরনের রাইফেল।
৬ জানুয়ারি দিনটিও শুরু হয়েছিল অন্য দিনের মতোই। তবে বিকেল চারটার দিকে হঠাৎ স্কুল ভবনের ভেতরে ঘটে ভয়াবহ বিস্ফোরণ। বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। আগুনের ফুলকি ও কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় আকাশ। মুহূর্তেই স্তব্ধ হয় শহর।
মুক্তিযোদ্ধাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দিন ঘোড়াঘাট উপজেলা ও নবাবগঞ্জ উপজেলা থেকে উদ্ধার করা মাইন একটি ট্রাকে করে আনা হচ্ছিল। নামানোর সময় অসাবধানতাবশত বিস্ফোরণ ঘটে। তখন ক্যাম্পে ছয় শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা অবস্থান করছিলেন।
এ দুর্ঘটনায় মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি পাশের কুমারপাড়া এলাকার বহু মানুষও নিহত হন। আহত হন শতাধিক ব্যক্তি। বিস্ফোরণের স্থানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ ফুট গভীর গর্ত তৈরি হয়।
পরদিন গোড়-এ-শহীদ ময়দান-এ শহীদদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমে ৮৬ জন এবং পরে ২১ জনের মরদেহ চেহেলগাজী মাজার প্রাঙ্গণে সামরিক মর্যাদায় দাফন করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেহের বিচ্ছিন্ন অংশ জোড়া দিয়ে একটি মরদেহের আদল তৈরি করে দাফন করতে হয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ৫০ জনের বেশি মানবদেহের অংশ উদ্ধার করা হয়েছিল।
পরে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে মহারাজা স্কুল প্রাঙ্গণে ১২০ জন এবং চেহেলগাজী কবরস্থানে ১৭৭ জন শহীদের নামসংবলিত ফলক নির্মাণ করা হয়।
স্বাধীনতার প্রায় ১৬ বছর পর, ১৯৮৮ সালে প্রথমবারের মতো এই মর্মান্তিক ঘটনার স্মরণে শোকসভা আয়োজন করে অমৃত সাহিত্য গোষ্ঠী, বাংলাদেশ হোমিও মেডিকেল ছাত্র ঐক্য পরিষদ ও পাটুয়াপাড়া জাগরণী ক্লাব। এর পর থেকে দিনাজপুরবাসী প্রতিবছর ৬ জানুয়ারি দিনটি ‘মাইন বিস্ফোরণ ট্র্যাজেডি দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে। এ উপলক্ষে গঠিত হয়েছে দিনাজপুর ‘৬ জানুয়ারি স্মৃতি পরিষদ’।
মাইন বিস্ফোরণে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণে বিদ্যালয় মাঠের পশ্চিম প্রান্তে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে একটি মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিসৌধ জাদুঘর নির্মাণ করা হয়। ২০২১ সালের মার্চে জাদুঘরটির উদ্বোধন করা হলেও পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো এটির কার্যক্রম শুরু হয়নি।
‘৬ জানুয়ারি স্মৃতি পরিষদ’-এর সদস্যসচিব সুলতান কামালউদ্দিন বলেন, ‘বিজয় ছিনিয়ে এনেও এই বীর মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীনতার সুফল পাননি। স্বাধীনতার পর এত বড় প্রাণহানির ঘটনা আর কোথাও ঘটেনি। অথচ দিনটির স্মরণে রাষ্ট্রীয় কোনো আয়োজন নেই। এমনকি নির্মিত জাদুঘরটিও চালু হয়নি। আমরা চাই, দিনটিকে জাতীয়ভাবে স্মরণ করা হোক এবং পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হোক।’